কুমারখালীতে চার দিনে ৩১ বার বিভ্রাট, বিদ্যুৎ ছিল না ৩৪ ঘণ্টা - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীতে চার দিনে ৩১ বার বিভ্রাট, বিদ্যুৎ ছিল না ৩৪ ঘণ্টা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ২৭, ২০২৬

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ ‘সকাল ৮টায় গেছে। আর এখন ১টা বাজে এলো। দিনে ৬-৭ বার যাওয়া-আসা করে। এভাবে বিদ্যুৎ দিয়ে কী কাজ করা যায়!’ গত শনিবার দুপুরে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভার তেবাড়িয়া এলাকার আমিরুল ইসলামের স্ত্রী জেরিনা খাতুন। তিনি গৃহকর্মের পাশাপাশি যন্ত্রের সাহায্যে লুঙ্গি তৈরির কাজ করেন। লোডশেডিংয়ের আগে তিনি দিনে প্রায় ১৫টি লুঙ্গি তৈরি করতেন।

এখন করতে পারছেন মাত্র ৭-৮টি। মিলন মাহবুব পেশায় দর্জি। একই উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জয়বাংলা বাজারে দোকান আছে তাঁর। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে আলাপকালে মিলন মাহবুব বলছিলেন, ‘কারেন্ট সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খুব বেশি হলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা থাকে। রাতে থাকে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। এভাবে চলে কীভাবে?’ তিনি বলেন, ‘আমার মেশিন তো কারেন্ট ছাড়া চলে না। মেশিন না চললে সংসার চলবে কী করে।’ 

মিলনের সংসারে ৭ জন সদস্য। আগে ৮০০ থেকে হাজার টাকা আয় হতো। এখন তা কমে অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে। গত বুধবার সারাদিনে মাত্র একটি শার্ট বানাতে পেরেছেন তিনি। এতে আয় হয়েছে ৩০০ টাকা। আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল বাদ দিলে এই ৩০০ টাকায় কী হয়!’ দিনের লোডশেডিংয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গত মঙ্গলবার দুপুর ২টা ১০ মিনিট থেকে গতকাল শনিবার দুপুর ২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত এই ফিডারে মোট ৩১ বার লোডশেডিং হয়েছে।

এই সময়ে ৩৪ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট বিদ্যুৎ ছিল না। অর্থাৎ চার দিনে ৯৬ ঘণ্টায় প্রায় ৩৩ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ পায়নি এলাকাবাসী। উপজেলার সদকী ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা আব্দুল হান্নান। তিনি একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি দুই বিঘা জমিতে আধুনিক প্রযুক্তিতে পেঁপের চাষাবাদ করছেন।

তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ১০ কাঠা জমিতে সেচ দিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত ৬-৭ বার বিদ্যুৎ গেছে। ‘এভাবে কি চাষাবাদ হয়’প্রশ্ন তার। চাহিদার তিন ভাগের মাত্র একভাগ বিদ্যুৎ পাচ্ছে কুমারখালীবাসী। তবে স্কাডা যন্ত্রের কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও ৪-৫ বার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।

যদুবয়রা সাব-স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, ৬টি ফিডারের মধ্যে ৩ নম্বর ফিডারে গত মঙ্গলবার দুপুর ২টা ১০ মিনিট থেকে ২টা ২৭, বিকেল ৩টা ৩৫ থেকে ৪টা ৩৫, রাত ৭টা ৩০ থেকে ৮টা ৩০, ৯টা ৩৫ থেকে ১০টা ৩৫, ১১টা ৩০ থেকে ১টা ৫, ২টা ১৫ থেকে ভোর ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। এরপর বুধবার দুপুর ১টা ২৮ থেকে ২টা ৮, ২টা ৩০ থেকে ৩টা ২৫, ৩টা ৩০ থেকে বিকেল ৫টা, সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টা ১৫, রাত ৮টা ৫ থেকে ৯টা ২০, রাত ১১টা থেকে ১২টা, ১টা থেকে ২টা, রাত ৩টা থেকে ভোর ৪টা ২০ মিনিট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে ৮টা ১৫, ১০টা থেকে ১১টা ৩৫, দুপুর ১২টা ৫০ থেকে ২টা ৫৫, বিকেল ৩টা ২৫ থেকে ৫টা ২০, রাত ৮টা ১৫ থেকে ৯টা, ১০টা ১৫ থেকে ৩৫ মিনিট, ১১টা থেকে ১২টা, ১২টা ১৫ থেকে ১টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। শুক্রবার ভোর ৪টা ৩২ থেকে সকাল ৯টা ৩৮, ১০টা ৫০ থেকে ১১টা ১০, ১২টা ১৮ থেকে ২৮ মিনিট, বিকেল ৩টা ১০ থেকে ৫৫, রাত ৮টা ১৬ থেকে ৫৮, রাত ১০টা ৩৫ থেকে ১১টা ২২, রাত ১২টা থেকে ১টা ২৫, ২টা ২৫ থেকে ৩টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়েছে।

তবে শনিবার ভোর থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছেন যদুবয়রা সাব স্টেশনের কর্মকর্তা মজিবুল হক। তিনি বলেন, যদুবয়রা সাব স্টেশনের আওতায় ৬টি ফিডার আছে। এখানে মোট গ্রাহক ১৮ হাজার। এর মধ্যে ৩ নম্বর ফিডারে প্রায় ৪ হাজার রয়েছে। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। এই স্টেশনে চাহিদার ৯ মেগাওয়াটের বদলে পাওয়া যাচ্ছে ৩-৪ মেগাওয়াট।

কুমারখালী পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সূত্র জানায়, তাদের গ্রাহক প্রায় ৭১ হাজার। এই উপজেলায় দিনে ও রাতে প্রায় সমান ২৫-২৬ মেগাওয়াট (মোট তিনটি স্টেশন মিলে) বিদ্যুতের চাহিদা। এর মধ্যে মঙ্গলবার থেকে মিলছে মাত্র ১০-১১ মেগাওয়াট। ফলে পর্যায়ক্রমে ১৬টি ফিডারের মধ্যে ৮টি বন্ধ রাখা হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি কুমারখালীতে তীব্র তাপদাহ চলছে। গতকাল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ।

আগের দিন শুক্র ও বৃহস্পতিবার তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি; তবে বুধবার ছিল ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তথ্য কুমারখালী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশিদের। তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ে মানুষের ভোগান্তি দেখতে বুধবার সকাল থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত উপজেলার যদুবয়রা, পান্টি, চাঁদপুর, বাগুলাট, চাপড়া ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন এ প্রতিবেদক।

জোতমোড়া গ্রামের গৃহিণী সুরাইয়া পারভীন বলেন, দিনের বেলায় যেমন-তেমন; রাতে বিদ্যুৎ থাকেই না। মঙ্গলবার রাত ২টা থেকে ভোর পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। তীব্র গরমে ঘেমে ছেলের (৭) প্রথমে ঠান্ডা লাগে পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। তখন চার্জার লাইটের সঙ্গে মেশিন লাগিয়ে ছেলেকে গ্যাস দিয়ে কোনোমতে রাত গেছে তাদের। একই গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী জারিন তাসনিন সন্ধি বলে, ‘একদিকে অসহ্য গরম। তারওপর সন্ধ্যা লাগলেই কারেন্ট থাকে না।

৩০-৪০ মিনিট পরপর চলে যায়। এভাবে কী পড়াশোনা করা যায়।’ বিদ্যুৎ সংকটে বিপদে পড়েছেন ব্যাটারিচালিত যানচালকেরা। পান্টি বাজার এলাকার ভ্যানচালক আহম্মেদ শেখ বৃহস্পতিবার বলছিলেন, ‘সারারাত চার্জ দিলে দিনে ভ্যান চালিয়ে ৬০০-৮০০ টাকা আয় করা যায়। গত বুধবার তেমন বিদ্যুৎ ছিল না। ভ্যানে যে চার্জ আছে, তাতে ৩০০ টাকা মারতেই শেষ হয়ে যাবে।’ বিদ্যুৎ লাইনে ‘স্কাডা’ যন্ত্র বসিয়ে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে খুলনা বিভাগীয় পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়।

ফলে লোডশেডিংয়ের জন্য নির্ধারিত সময়ের বাইরেও অতিরিক্ত ৪-৫ বার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কুমারখালী পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম বিপাশা ইসলাম। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্কাডা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। স্কাডা যন্ত্রটি অপসারণ নিয়ে জেলার সমন্বয় সভায় আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতারও।