বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় স্বামীর বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক তালাক এবং পুলিশের সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী মোছাঃ সেতু খাতুন (২০) বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়ার খাজানগর এলাকার বাসিন্দা সেতু খাতুনের সঙ্গে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোঃ আশিক ইসলামের (৩০) বিয়ে হয়।
বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, তার স্বামী পূর্বে বিবাহিত এবং তার স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। এরপর থেকেই তাকে বিভিন্ন সময়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। ভুক্তভোগীর দাবি, চলতি বছরের ৫ এপ্রিল স্বামী তাকে মারধর করে জোরপূর্বক তালাক দিতে বাধ্য করেন এবং বাড়ি থেকে বের করে দেন। এর আগে টাকার বিনিময়ে তালাকনামা দিতে বাধ্য করা এবং পরে পুনরায় সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে সেই টাকা ফেরত নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
তার দাবি, এখানে আসছি তিনদিন হইলো। পরশুদিন আসছিলাম, আমার হাজবেন্ড আমাকে অনেক মারধর করছে। আর তারপর আসছি, এখনো আমাকে বাড়িতে তুলছে না। এর আগে আমি মিরপুর থানায় গেছি, সেখান থেকে নাজমুল স্যার জগতি ফাঁড়ির এসআই সালাউদ্দিন স্যারকে ফোন দেয়। মানে সে আসতে চায় না, সে আসবে না। জগতি ফাঁড়ির এসআই সালাউদ্দিন স্যার নাকি নিষেধ করছে তাকে। সালাউদ্দিন স্যারকে কল করে নাজমুল স্যার বলেছে স্যার আপনার এই বিষয়টা আমি দেখছি, আমি মেয়েটাকে পাঠায় দিচ্ছি। তো আমি ওখান থেকে নিরুপায় হয়ে সালাউদ্দিন স্যারের কাছে আসি।
আইসা স্যারকে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বলি। আর স্যার হচ্ছে আমার হাজবেন্ডের ফ্রেন্ড। আমাদের পুরা বিষয়টাই স্যার জানে। তো স্যারকে আমি সবটা জানাই। জানানোর পরে স্যার বলে কী—আমি এটা কিছু করতে পারবো না, তুমি অন্য ব্যবস্থা নাও। স্যার আমাকে কোনো হেল্প করে নাই। আর এখানে আমার হাজবেন্ডও আমাকে বাসায় তুলছে না। সে আমাকে ফোন দিয়ে অনেক থ্রেট দিছে মেরে ফেলবে, হ্যান করবে, ত্যান করবে। সেও আমাকে বাসায় তুলছে না।
ভুক্তভোগী আরো অভিযোগ করেন, সম্প্রতি কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এতে তার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা আরও বেড়েছে। এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার পর বিকেলে আহম্মদপুর পুলিশ ক্যাম্পে বসে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে। ৫০ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়েছে।
জগতি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সালাউদ্দিন বলেন, কোনো দাম্পত্য বিষয়ে কাউকে জোর করে বাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের নয়। তবে মারধর বা ফৌজদারি অভিযোগ থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, আহম্মদপুর পুলিশ ক্যাম্পের কোন কাজে হস্তক্ষেপ করেননি তিনি। তবে এস আই নাজমুল তাকে ফোন করে বিষয়টি সমাধান করার কথা বললে তিনি সেই দায়িত্ব নেননি। তাকেই বিষয়টি দেখার জন্য বলেছেন।
তাছাড়া আশিকের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রশ্নে তিনি বলেন, দেড় বছর ক্যাম্পে আছি কত মানুষের সাথেই তো সুসম্পর্ক আছে। এ বিষয়ে আহাম্মদপুর পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাজমুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ঘটনায় কোনো ধরনের অবহেলা করা হয়নি। বিষয়টি মূলত পারিবারিক এবং উভয়পক্ষ স্থানীয়ভাবে বসে আপস-মীমাংসা করেছে। তিনি আরও বলেন, উভয়পক্ষকে ডেকে স্থানীয়ভাবে বসিয়ে কথা বলা হয় এবং তারা নিজেরাই মিটমাট হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
অতীতেও তাদের মধ্যে বিবাহ, তালাক ও পুনর্মিলনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা দাবি করেন, ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার সরাসরি কোনো পূর্ব যোগাযোগ হয়নি। মেয়েটি থানায় এসে বিষয়টি জানালে তাকে আদালতের মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এটি একটি পারিবারিক ও আইনি বিষয়। তাছাড়া এস আই সালাউদ্দিনের সাথে কোন কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাকে এস আই সালাউদ্দিন ফোন করে ঘটনাটি জানিয়েছিলেন তবে স্থানীয়ভাবে কেউ না জানানোয় কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সালাউদ্দিন সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, এর আগে এই দম্পতির কলোহ নিয়ে মডেল থানায় অভিযোগ হয়েছিল। তিনি ঐ অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছিলেন। তার এই সম্পর্কে অনেক কিছু জানা আছে। তাছাড়া আশিক তার ক্যাম্প এলাকায় ব্যবসা বাণিজ্য করে এজন্য তাকে হয়তো ফোন দিয়েছিল। তাই হয়তো ফোন দিয়েছিল। তবে এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আশিক ইসলামের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, একটি সংবেদনশীল পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি বলে তারা মনে করছেন। এ ব্যাপারে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ শহীদুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
