কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ আমি ওর বড় ভাই। পাশের উপজেলায় শ্বশুর বাড়িতে থাকি। খবর শুনে এসে দেখি ওর মাথা, পায়ের রগ, পাজর মিলে ১২টির বেশি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহৃ। রক্তাক্ত শরীরটি ক্ষতবিক্ষত। খুব কষ্ট দিয়ে মারেছে। থানায় মামলা করেছি। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই। গতকাল শনিবার (২৮ মার্চ) দুপুর ১টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা চত্বরে দাঁড়িয়ে কথা গুলো বলছিলেন নিহত তাজেল আলী তাজেমের (৩৮) বড় ভাই মো. হাসেম আলী। তাঁরা উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের বুজরুক বাঁখই গ্রামের কাশেম আলীর ছেলে।
এরআগে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বুজরুখ বাঁখই মাধ্যমিক বিদ্যালয় গেটের সামনের পাকা সড়কের ধার থেকে তাজেমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। বড় ভাই হাসেম আলী বলেন, কারা খুন করেছে তা তো দেখিনি। তবে ওর (তাজেম) সাবেক স্ত্রী নিয়ে প্রতিবেশী মোক্তার আলীর প্রবাসী ছেলে মিরাজের পরকিয়া প্রেমের ঝামেলা ছিল। হয়তো ওরাই ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।
পুলিশ, স্বজন ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে বুজরুখ বাঁখই গ্রামের ভ্যানচালক তাজেমের স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিবেশী মিরাজের পরকিয়া প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে তাজেম তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন। এ নিয়ে দুইটি পরিবারের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে সেই সময় মিরাজসহ তার স্বজনরা তাজেমকে ব্যাপক মারধর করে। একপর্যায়ে তাজেম মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে বিভিন্ন স্থানে তাকে চিকিৎসা করানো হয়।
তবে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেননি। মিরাজকে দেখলে তিনি মেজাজ হারিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এ সব নিয়ে তাঁদের মধ্যে একাধিকবার ঝগড়া, হাতাহাতি ও বসাবসি হয়েছে। এক পর্যায়ে মিরাজ প্রবাসে চলে যান। আরো জানা গেছে, সম্প্রতি মিরাজ গ্রামের বাড়িতে আসলে তাজেম মেজাজ হারিয়ে পথেঘাটে তাকে বিরক্ত শুরু করেন। সেজন্য সপ্তাহখানেক আগে মিরাজ ও তার ভাই আরমিনসহ তাঁদের লোকজন তাজেমকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন।
এরইমধ্যে শুক্রবার এশার নামাজের আগে তাজেম বাড়ি থেকে বের হয়েছিল আর রাত সাড়ে ৯টার দিকে সড়কের ধার থেকে তাঁর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় শনিবার দুপুরে অজ্ঞাত আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তাঁর বড় ভাই হাসেম আলী। এজাহারে পরকিয়া প্রেম ও প্রেমিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শুক্রবার রাতে সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, বুজরুখ বাঁখই বটতলা – মির্জাপুর সড়ক ঘেঁষে বুজরুক বাঁখই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাকা গেট। গেটের সামনের একটি লিচু বাগান। পাকা সড়ক ঘেঁষে পড়ে আছে তাজেমের রক্তাক্ত মরদেহ। তাঁর হাত, পা ও শরীরের একাধিক স্থানে আঘাতের ক্ষত। সেখানে কাজ করছে পুলিশ। ভিড় করেছে উৎসুক জনতা। এ সময় নিহত তাজেমের চাচাতো ভাই বিপুল হোসেন বলেন, রাতে বাড়ির বাইরে অনেক চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছিল। বাড়ির লোকজন আমাকে বাইরে আসতে দেয়নি। পরে আসে দেখি রাস্তার ধারে রক্তাক্ত মরদেহ। তখন পুলিশ, সাংবাদিক ও অন্যদের খবর দিই।
আরেক চাচা ভাই রাজু আহমেদ আক্ষেপ করে বলেন, এটি ব্যস্ত রাস্তা। সবসময় মানুষ চলাচল করে। কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। নিশ্চয় সেসময় চিৎকার চেঁচামিচি হয়েছে। কিন্তু শুনেও কেউ এগিয়ে আসেনি। তাঁর ভাষ্য, হামলাকারী চিহিৃত সন্ত্রাসী হওয়ায় কেউ এগিয়ে আসেনি। দেখলেও মুখ খুলছে না।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ মিটার দুরে নিহত তাজেমের বাড়ি। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলে তাজিনকে (১১) জড়িয়ে ধরে আহাজারি করছেন মা সাহিদা খাতুন। ঘরের বারান্দায় আহাজারি করছেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা আবুল কাশেম। তাঁদের শান্ত্বনা দিচ্ছেন স্বজনরা। এ সময় বিলাপ করতে করতে মা সাহিদা খাতুন বলেন, আমার বেটার মাথায় ই (সমস্যা) হয়ছে। সগলের পাছেই ( পিছনে) ইলিং – ভিলিং ( পাগলামো) করে -রে।
সেই জন্যই আমিও বড়ি খাওয়ায়া ঘোম আসা থুইরে। আজকে দুইদিন বড়ি খাওয়ায়নে। দুহানের পর যায় আসে। ওম্বা বেড়ায় আর খালি বিড়ি খায়। আজ এশার নামাজের আগে গিছিল। নামাজ পড়ে শুনি এইতা। তিনি বলেন, আগের বউ নিয়ে ঝামেলা কারণে সাতদিন আগে আরমিন বলেছে যে সাতদিন পরে মারবো। সাতদিন পরেই মারলো। সাতদিন পরেই মারেছে।
তাঁর ভাষ্য, সাবেক বউয়ের পরকিয়া প্রেমিক মোক্তারের ছেলে মিরাজ, রুস্তমের ছেলে আরমিন ও তাদের লোকজন ছেলেকে হত্যা করেছে। এহন বিচার চাই। এ দিকে ঘটনাার পর থেকে অভিযুক্ত মিরাজ, আরমিনসহ তাদের লোকজন স্ব পরিবারে পলাতক রয়েছে। তাদের বাড়িতে ঝুলছে তালা। মুঠোফোনও বন্ধ। সেজন্য তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুপুরে কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাজেমকে হত্যা করেছে অজ্ঞাত আসামিরা। শরীরের একাধিক স্থানে ক্ষত রয়েছে। এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা রুজু হয়েছে। তথ্য উপাত্ত উদঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে পুলিশ।
