চলতি মৌসুমে আড়াই বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করছেন কৃষক ভাদু মন্ডল। তবে, বর্তমানে চরম হতাশায় ভুগছেন তিনি। সেচের অভাবে তার জমির ধান মরে যাচ্ছে।
একদিন পর পর চার লিটার ডিজেল প্রয়োজন।
তিনি পাচ্ছেন সপ্তাহে দুই লিটার। একদিন তেল নিতে পাম্পে গেলে লাইনে দাঁড়িয়ে তাকে ওইদিন বিনাশ্রমে কাটাতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে ধান মরে মাঠ সাদা হয়ে যাবে বলে আশংকা ভাদু মন্ডলের।
ভাদু মন্ডল বলেন, ‘আড়াই বিঘা ধানের জমিতে একদিন পর পর পানি দেওয়া লাগে।
ঠিকমতো ডিজেল না পাওয়ায় জমিতে পানি দিতে পারছি না। আমলা পাম্প, মিরপুর পাম্পে তেল না পেয়ে দুইদিন আগে কুষ্টিয়া থেকে দুই লিটার তেল নিয়ে এসেছিলাম।
সেই তেল দিয়ে আজকে পানি নিচ্ছি। না হলে ধান শুকিয়ে যেতো।
চার লিটার তেলের পরিবর্তে দুই লিটার দিয়ে সেচ দিচ্ছি, কোনরকম জান বাঁচানোর মতো পানি দিচ্ছি’।
এমন চিত্র শুধুমাত্র কৃষক ভাদু মন্ডলের না। কয়েকদিন ধরে জ্বালানি তেল পাওয়া নিয়ে শংকর কারণে সেচ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় কুষ্টিয়ার প্রায় সব এলাকার ধান চাষিদের।
বেশিরভাগ সময়ই তেলের অভাবে সেচ পাম্পগুলো বন্ধ থাকছে। প্রয়োজনমতো ডিজেল না পেয়ে কৃষকরা বিপাকে পড়ছেন।
জেলার ভেড়ামারা, মিরপুর উপজেলা দিয়ে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের প্রধান ক্যানালে পানি থাকা সত্ত্বেও শাখা ক্যানেলের সামনে ও পার্শ্ববর্তী জমিতে তামাকের চাষ হওয়ায় সেচের পানি পাচ্ছেন না ধান চাষির।
মিরপুর উপজেলার কচুবাড়ীয়া গ্রামের কৃষক রুকমান হোসেন এবার পাঁচ বিঘা জমিতে ধানের চাষ করছেন। তিনি জানান, প্রতিদিন তার পাঁচ লিটার তেল প্রয়োজন সেচের জন্য। সেখানে পাম্পে গেলে ২০০ টাকার তেল দিচ্ছে। পানি দিতে না পারলে ধান চাষ ছেড়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা টিভিতে দেখছি তেল আছে, কিন্তু আমরা কৃষকরা তো তেল পাচ্ছি না। যদি জমি পাম্প থেকে একটু দূরে হয়, তাহলে যে এক লিটার তেল পাচ্ছি তেল পাম্প থেকে তার পানি ক্যানেল দিয়ে জমিতে আসতে গিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে’।
একই এলাকার কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, জনপ্রতি দুই লিটার করে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। আমার প্রয়োজন ১০ লিটার। এই তেল দিয়ে কাজ তো হয় না, নাম মাত্র যা হয় তাই করছি। তেল নিতে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালেই দিন শেষ, অন্য কাজ হচ্ছে না আর’।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সেচের জন্য ঠিকমতো তেল পাওয়ার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেবে সরকার।
পাম্প মালিকদের দাবি, তারা পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ার কারণে এ অবস্থা দেখা দিয়েছে। তবে কৃষকদের তারা চাহিদার তুলনায় কম হলেও তেল দিচ্ছেন।
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, কৃষি জমিতে সেচের জন্য জেলার ৬টি উপজেলায় ২৫ হাজার ৭৫৫টি অগভীর এবং ২২৬টি গভীর এবং ২৯৭টি এলএলপি পাম্প রয়েছে।
সর্বমোট ২৬ হাজার ২শ ৭৮টি পাম্প এবং ২ হাজার ২শ ৪৫ হেক্টর জিকে সেচের পানিসহ ৯০ হাজার ৯শ ৯৩ হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে।
এসব পাম্পের মধ্যে ৪ হাজার ২শ ১টি বিদ্যুতচালিত এবং ২২ হাজার ৭৭টি রয়েছে ডিজেল চালিত। যার মাধ্যমে ৮৮ হাজার ৭শ ৪৮ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়।
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শওকত হোসেন ভুঁইয়া বলেন, ‘কৃষকরা যাতে ঠিকমতো জমিতে সেচ দিতে পারে এজন্য আমরা জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলেছি। কৃষকরা যাতে সেচের জন্য ডিজেল পায় এজন্য আমরা তৎপর রয়েছি’।
তিনি আরো বলেন, কুষ্টিয়ার বেশিরভাগ এলাকা জিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় হওয়ায় কৃষকদের তেমন স্যালো ইঞ্জিনচালিত এবং বৈদ্যুতিক পাম্পের সেচের প্রয়োজন হয় না।
তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার সাথে মিল পাওয়া যায়নি জেলার শীর্ষ এই কৃষি কর্মকর্তার কথার।
