বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত ৫ ই আগস্ট কুষ্টিয়ায় আন্দোলকারী সহ ৯ জন হত্যার স্বীকার হয়েছে। আর এই হত্যাকান্ডের বিষয়ে গতকাল কুষ্টিয়া মডেল থানায় দুইটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুইটি মামলাতে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ (সদর আসন) এর সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফ এবং জেলা আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী অধিকাংশ নেতা সহ আ‘লীগের শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়েছে।
যদিও অভিযুক্ত সকল আসামীই ৫ আগস্টের পর থেকে আত্নগোপনে রয়েছেন। অভিযুক্ত আসামীদের কয়েকজনকে প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। কিন্তু মামলা হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও তাদেরকে পাওয়া যায়নি। অভিযুক্তদের মধ্যে জেলা আওয়ামীলীগের তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব’র ফেসবুক ৬ তারিখেই ডিঅ্যাক্টিভেট করা হয়।
আওয়ামীলীগের এই নেতার বিরুদ্ধে গতকাল শুক্রবার (১৬ আগস্ট) তিনটি পৃথক মামলা হয়েছে। কুষ্টিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ১৩ বছর বয়সী আব্দুল্লাহকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। মামলায় কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে হত্যার হুকুমের আসামি করা হয়েছে। অস্ত্র দিয়ে গুলি করার আসামি করা হয়েছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতাকে।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) নিহত আব্দুল্লাহর বাবা লুকমান হোসেন কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ৫ আগস্ট ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে থানাপাড়ার আড়ংয়ের সামনে রাস্তার উপর আন্দোলনকারী বাবুকে এলোপাথাড়িভাবে মারপিট ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রাইসুল হক বাদী হয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতাকর্মী জনপ্রতিনিধিসহ মোট ৩৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও ৪০-৫০ জনকে। নিহত বাবু কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামের শালদহ এলাকার মৃত নওশের আলীর ছেলে।
বাবু পেশায় স্বর্নকার ছিলেন। বাবু হত্যা মামলায় হুকুমের আসামি করা হয়েছে-কুষ্টিয়া সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, আতাউর রহমান আতা কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হাজী রবিউল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলীকে।
এছাড়াও এ মামলার আসামি করা হয়েছে-কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারন সম্পাদক মানব চাকী, হাসিব কুরাইশি, কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান অনিক, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ফেরদৌস, হাবিবুর রহমান হাবি, রেজাউল ইসলাম বাবু, মহিদুল কমিশনার, মাহাবুল, শেখ আহাম্মেদ কৌশিক বিচ্ছু, মিলন মন্ডল, কিশোর কুমার ঘোষ, ফজলে করিম খোকা, সোহেল রানা আশা, অনুপ কুমার নন্দী, পল্লব, গৌরব চাকি, মমিজুর রহমান মোমিজ, মানিক, তানভীর নোবেল, রুবেল, মধু, রঞ্জু আল মুনিম, সাহাজুল ইসলাম, চ্যালেঞ্জ, নূর মোহাম্মদ পুকারি, রাজিব হোসেন, জিয়াউল ইসলাম স্বপন, ইয়াসির আরাফাত তুষার, রবিউল ইসলাম, জহুরুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতাকর্মী জনপ্রতিনিধিসহ মোট ৩৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।
গত ৫ অগাস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শহরের ছয় রাস্তার মোড়ে আব্দুল্লাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আব্দুল্লাহ কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিস অফিস সংলগ্ন চায়ের দোকানে বাবার সাথে কাজ করতো। আব্দুল্লাহ চর থানা পাড়ার লোকমান হোসেন ছেলে। আব্দুল্লাহ হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে করা হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতাকর্মী জনপ্রতিনিধিসহ মোট ১৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও ১০/২০ জনকে। এ মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন- জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত তুষার, কুষ্টিয়া পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাজেদুল ইসলাম ধীমান, জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব, সোহেল রানা, আরিফ হোসেন, রনি, মিন্টু, আনোয়ার হোসেন, হান্নান বিশ্বাস, সাইদুল ইসলাম, তরুণ, নিপুন।
নিহত আব্দুল্লাহর পিতা লোকমান এজাহারে উল্লেখ করেছেন, আমার সন্তান আব্দুল্লাহ (১৩) আমার সাথে কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিস গেটে চায়ের দোকানে কাজ করতো। আমি অসুস্থ হয়ে শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। ৫ আগস্ট দুপুর ২ সময় আমার সন্তান হাসপাতাল থেকে বাড়িতে যাচ্ছিলো আমার জন্য খাবার নিয়ে আসতে। পথিমধ্যে ৩টা ৫মিনিটের দিকে থানাপাড়া ছয়রাস্তার মোড়ে পৌঁছালে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের মুখে পড়ে। একপর্যায়ে এক নম্বর আসামী (কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ হুকুমে অন্যান্য আসামীরা দিক-বিদিক এলোপাতাড়ী ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। আমার সন্তান মিছিলের মধ্যে পড়ে গিয়ে দিশেহারা হয়ে যায়।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে-একপর্যায়ে আমার সন্তান মিছিল থেকে পালানোর সময় ২ নম্বর আসামি (কুষ্টিয়া সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা) তার হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে আমার সন্তানের বুকে গুলি করে। তাৎক্ষনিক আমার সন্তান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অন্যান্য আসামীরা আমার সন্তানকে লক্ষ্য করে ইট- পাটকেল নিক্ষেপ সহ কিল-ঘুষি মারতে থাকে। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন রক্তাক্ত অবস্থায় আমার সন্তানকে দ্রুত কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আমার সন্তানকে মৃত্যু বলিয়া ঘোষণা করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন-আমার সন্তানের দাফন কাপনের কাজ শেষে আমি শোকার্থ থাকায় আসামীদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ এবং আমার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় সমন্বয়কদের সহিত আলাপ আলোচনা করিয়া, বৈষ্যম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন পরবর্তীতে খানা কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় থানায় আসিয়া এজাহার দায়ের করিতে বিলম্ব হইল। নিহতের বাবা লোকমান হোসেন বলেন, আমার ছেলেকে মারপিট ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। একই সাথে বাবু হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বাবু হত্যা মামলার বাদী রাইসুল হক। স্বর্ণকার বাবু হত্যা মামলার বাদী রাইসুল হক এজাহারে উল্লেখ করেছেন, আমি কুষ্টিয়া সরকারী কলেজে ডিগ্রী ৩য় বর্ষে পড়াশুনি করি।
গত ১৭ জুলাই হতে আমি , বাবু (নিহত) সহ অনেক লোকজন কোটা বিরোধী আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্নস্থানে মিছিল করে আসিতেছিলাম। ৫ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে বকচত্বরে অবস্থানকালে আসামীরা হাতে দেশীয় অস্ত্র, লাঠি-সোঠা ও ধারালো চাপাতি নিয়ে আমাদের পথরোধ করে। ১.২, ৩ ও ৪ নং আসামীরা হুকুম দেয় যে, শালাদের খুন করে ফেল (আসামি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হাজী রবিউল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী)।
তাদের হুকুম পাওয়ার সাথে সাথে আসামীরা তাদের হাতে থাকা দেশীয় অস্ত্র, লাঠি-সোঠা ও ধারালো চাপাতি নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আমাদেরকে ধাওয়া করে। তখন আমরা জীবন বাঁচানোর জন্য ছয় রাস্তার দিকে দৌড় দিই। ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে থানাপাড়ার আড়ংয়ের সামনে রাস্তার উপর পৌঁছাইলে আসামীরা বাবুকে পিছন দিক থেকে ধারালো চাপাতি দিয়ে কাঁধের উপর কোপ মারিয়া গুরুত্বর রক্তাক্ত কাটা জখম করে এবং তাৎক্ষনিক সে রাস্তার উপর পড়ে যায়।
তখন ৫নং আসামী (কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারন সম্পাদক মানব চাকী) বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার মাথার ডান পাশে একটি কোপ মেরে গুরুত্বর রক্তাক্ত জখম করে। ৭নং ও ৮নং আসামি (কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান অনিক ও কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ফেরদৌস) ধারালো চাকু দিয়ে ভিকটিম বাবুর শরীরের বিভিন্নস্থানে কোপ মারিয়া রক্তাক্ত জখম করে। ১০ নম্বর আসামী (কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রেজাউল ইসলাম) বাবুর ডান হাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করিলে তার হাড়ভাঙ্গা জখম হয়। ১১, ১২, ১৩ নম্বর আসামি (মহিদুল কমিশনার, মাহাবুল ও কৌশিক কাউন্সিলর) বাবুকে এলোপাতাড়ীভাবে ধারালো চাপাতি ও চাকু দিয়ে আঘাত করলে শরীরের বিভিন্নস্থানে জখম প্রাপ্ত হয়।
অন্যান্য আসামীরা এলোপাতাড়ী বাবুকে মারপিট করিয়া জখম করে। আমরা তাকে বাঁচাতে আগাইয়া আসিলে ৬নং ও ৯ নম্বর আসামি (হাসিব কুরাইশি ও হাবিবুর রহমান হাবি) আমাদের দিকে লক্ষ্য করে পিস্তল দিয়ে গুলি করে এবং সামনে আগাইয়া আসলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। বাবু নিস্তেজ হয়ে গেলে আসামীরা উল্লাস করতে করতে বকচত্তরের দিকে চলে যায়। তখন আমরা ভিকটিম বাবুকে আহত জখম অবস্থায় উদ্ধার দ্রুত কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বাবুকে মৃত ঘোষণা করেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজুর রহমান বলেন, আব্দুল্লাহ ও বাবু হত্যার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। দুই মামলায় শতাধিক জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখনো কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।
