কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, তথ্য সংগ্রহকালে সাংবাদিকের ওপর হামলা 

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ কাজের কাঙ্খিত অগ্রগতি না হওয়ায় ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল এবং ব্যাংকে থাকা জামানতের অর্থ বাজেয়াপ্তের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। পরে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে কাজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি ব্যবহৃত উপকরণ দ্রুত অপসারণের লিখিত নির্দেশও দেওয়া হয়। কিন্তু এসব নির্দেশের পরও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে চলছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভার গণমোড়-হিম্মতমোড় মোড় সড়ক নির্মিণের কাজ। আর এ সব অনিয়মের খবর পেয়ে তথ্য সংগ্রহে গিয়ে নির্মমভাবে হামলার শিকার হয়েছেন এক সাংবাদিক।

গতকাল শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে কুমারখালী পৌরসভার কালিবাড়ী মন্দিরের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে। আহত সাংবাদিক এম এ উল্লাস বাংলা টিভির কুমারখালী-খোকসা প্রতিনিধি এবং কুমারখালী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়াও তিনি কুমারখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড এলংগী এলাকার মৃত আব্দ্লু মজিদের ছেলে। তাঁর চোখে, মুখে, পিঠে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের ক্ষত রয়েছে। বর্তমানে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সাংবাদিক এম এ উল্লাস অভিযোগ করে বলেন, ‘ কাজের মান খুবই নিম্নমানের।

গত সপ্তাহে অনিয়ম নিয়ে বাংলা টিভিতে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর পৌর কর্তৃপক্ষ কাজ বন্ধ করে দেন। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য করে ফের কুষ্টিয়া ৪ আসনের জামায়াতের এমপি আফজাল হোসেনের ছেলে শোভন, চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন ও জিয়াউর রহমান, এমপির বডিগার্ড পরিচয়দানকারী রুহুল আমিন এবং তাঁদের লোকজন হামলা চালিয়ে। আমি অবশ্যয় থানায় মামলা করব। দোষীদের শাস্তি চাই।’ তাঁর ২০ মার্চ রাতে এমপির এই বাহিনীর লোকজনই ওসির গাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

কুমারখালী পৌরসভা ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) প্রকল্পের ৫ নম্বর প্যাকেজের আওতায় গনমোড় থেকে হিম্মত মোড় পর্যন্ত রাস্তার উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে।প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে কাজের ঠিকাদার নড়াইলের নূর কনস্ট্রাকশন। ২০২৩ – ২৪ অর্থবছরের শুরু হওয়া এই কাজের মেয়াদ এক বছর। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে কাজের অগ্রগতি মাত্র ১৪ ভাগ। ফলে এলজিইডির আওতাধীনন এই কাজ নিয়ে গত ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালক তোফায়েল আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি কুমারখালী পৌরসভার প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।চিঠিতে বলা হয়, চুক্তিপত্র অনুযায়ী আনুপাতিক হারে কাজের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।

এতে দাতা সংস্থার কাছে এলজিইডি তথা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এর আগে একই প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পৌরসভাকে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তাও প্রকল্প পরিচালককে জানানো হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট প্যাকেজের অনুকূলে ব্যাংকে সংরক্ষিত জামানতের অর্থ বাজেয়াপ্ত করে ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পৌরসভাকে অনুরোধ করা হয়। বিষয়টি ‘অতীব জরুরি’ বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এরপর গত ১৮ আগস্ট কুমারখালী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশনের মো. ইউনুস আল মামুনকে চিঠি দেন। চিঠির বিষয় ছিল—নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী অপসারণ এবং রাস্তার নিম্নমানের কাজ বন্ধ রাখা। কিন্তু ইউএনওর নির্দেশনা অমান্য করে কু্ষ্িটয়া ৪ আসনের জামায়াতের এমপি আফজাল হোসেনের ছেলে শোভন, চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন ও জিয়াউর রহমান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা রুহুল আমীন এবং তাদের লোকজন নিম্নমানের সামগ্রী নিয়ে কাজ চলমান রাখেন। আরো জানা গেছে, শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পৌর প্রশাসক ও ইউএনও ফারজানা আখতার সরেজমিন গিয়ে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিলে এমপির স্বজনরা বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।

সেসময় বাংলা টিভির সাংবাদিক এম এ উল্লাস  এবং সমকাল ও এনটিভির অনলাইনের কুমারখালী প্রতিনিধি বাগবিতণ্ডা ও কাজের অনিয়মের দৃশ্য ধারণ করেন। এরপর ইউনিয়নও কাজ বন্ধের নির্দেশনা দিয়ে চলে গেলে কালিবাড়ী মন্দিরের সামনে এমপির স্বজনরা উল্লাসের ওপর হামলা চালায় এবং অপর সাংবাদিককে চিত্র ধারণে বাঁধা দিয়ে পথ অবরোধ করে রাখেন। হামলার সময় ঘটনাস্থলে এক এসআই সহ তিনজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের টেষ্টা করলেও এমপির স্বজনদের হামলায় গুরুতন আহত হন সাংবাদিক উল্লাস। সরেজমিন কালিবাড়ী মন্দির এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিম্নমানের ইট দিয়ে চলছে সড়ক নির্মাণের কাজ। সেখানে জামায়াত, বিএনপির নেতাকর্মী ও সাংবাদিকরা ভিড় করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে পুলিশ। এ সময় কুমারখালী উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান সবুজ বলেন, কাজের মান খুবই নিম্নমানের।

সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানায়। এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, আহত উল্লাসকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকরা ও প্রশাসনের কর্তারা ভিড় করেছেন। এ সময় উপজেলা যুবদলের আহবায়ক ও স্থানীয় লালনভূমি পত্রিকার সম্পাদক জাকারিয়া আনছার মিলন বলেন, সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অবশ্যয় দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কুমারখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি লিপু খন্দকার বলেন, ‘ আমাদের কুষ্টিয়া ৪ আসনের এমপির ছেলে ঠিকাদারী কাজের সাথে সম্পৃক্ত। কাজের শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়ম। আমরা এর আগেও তুলে ধরেছি। গতকাল থেকে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে আবার কাজ শুরু হলে সাংবাদিকরা যায়। এমপির লোকজন সাংবাদিকদের প্রচণ্ডভাবে অপমানিত করে। আজ আবার এমপির ছেলে (শোভন) নেতৃত্বে শিবিরের ছেলেপেলে সাংবাদিক উল্লাসের ওপরের হামলা করেছে।

এটা আমরা কোনভাবে টলারেট করবনা। প্রয়োজনে কুমারখালী অচল করে দিবো।’ কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক ফারজানা আখতার বলেন, “পৌর সড়কে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। এরপরও তারা কাজ চালিয়ে যাওয়ায় আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দিই। সেসময় তারা আমার সঙ্গে বাগবিতণ্ডা করেন। আমার চলে আসার পরপরই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। জড়িতদের সনাক্তের কাজ চলছে।’ কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, “সংবাদ সংগ্রহের সময় বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে হামলার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি। জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে, মামলার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দ্রুতই দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

 

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর