বৈশাখের প্রথম দিনে বৈশাখীকে পেয়ে খুশি সকলেই - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

বৈশাখের প্রথম দিনে বৈশাখীকে পেয়ে খুশি সকলেই

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ১৬, ২০২৬

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে সবাই যখন নববর্ষ বরণে ব্যতিব্যস্ত। তখন প্রসববেদনা নিয়ে সরকারি হাসপাতালের বেডে ছটফট করছিলেন মাত্র ১৪ বছর বয়সি মারিয়া খাতুন। তবে ছুটির দিন হওয়ায় হাসপাতাল ছিলেন না চিকিৎসক। ছিলোনা জরুরী সিজারিয়ানের ব্যবস্থাও। পরে স্বজনদের পরামর্শে সকাল ৮টার দিকে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি হন। সেখানেও তাৎক্ষণিক ছিলেন না চিকিৎসক।

পরে চিকিৎসকের ব্যবস্থা করে দুপুর ১২টার দিকে মারিয়াকে নেওয়া হয় ওই ক্লিনিকের সিজারিয়ান কক্ষে। সেখানে সিজারিয়ানের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় নরমল ডেলিভারিতে এক ফুটফুটে কণ্যা সন্তানের জন্ম দেন অপ্রাপ্ত বয়সি মা মারিয়া। জন্মের শিশুটির ওজন ছিল দুই কেজি ৮০০ গ্রাম। নববর্ষ ও বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে জন্ম নেওয়ায় নবজাতকের নাম রাখা হয়েছে বৈশাখী। মা ও শিশু সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বজনরা।

এরআগে গত সোমবার বিকেল ৪টার দিকে রাজবাড়িতে প্রসববেদনা শুরু হয় মারিয়ার। সময় গড়ার সাথে সাথে বেদনার তীব্রতা বাড়লে রাত ৮টার দিকে তাকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দুরে অবস্থিত লোটাস হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তিনি সন্তান প্রসব করেন। প্রায় ২০ ঘণ্টা প্রসববেদনার পরে নববর্ষের প্রথম দিন নরমল ডেলিভারিতে ফুটফুটে কণ্যা সন্তানের আগমন ঘটায় খুব খুশি মারিয়া, তাঁর রাজমিস্ত্রি স্বামী মাসুদ রানা (১৮), শ্বশুর, শাশুড়ি, মা শিমা খাতুন, বাবা আব্দুর রহিম, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সকলেই।

মারিয়া – মাসুদ রানা দম্পতি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের ধর্মপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। মাত্র দুই মাসের প্রেমের সম্পর্কের টানে ২০২৫ সালের ৬ জুন তাঁরা বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের এই বিয়ে মাসুদের পরিবার মেনে নিলেও সেদিন মানতে পারেনি মারিয়ার বাবা – মা। পরে মারিয়া ৫ মাসের অন্ত:স্বত্বা হওয়ার খবর পেয়ে বাধ্য হয়ে তাঁদের বিয়ে ধীরেধীরে মানতে থাকেন মারিয়ার বাবা – মাও। আজ নববর্ষের প্রথমদিনে বৈশাখীকে পেয়ে অতীতের দুঃখ – কষ্ট ভুলে মারিয়া – মাসুদের প্রেমের বিয়ের পূর্ণ স্বীকৃতি বৈশাখীর নানা – নানিও। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, লোটাস হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের বেডে শুয়ে আছেন মারিয়া খাতুন।

পাশের একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে শিশু বৈশাখীকে কোলে নিয়ে বসে আছেন তাঁর নানি শিমা খাতুন। তাঁদের হাস্যজ্জল চোখে – মুখে বয়ছে আনন্দের ধারা। এ সময় একগাল মুচকি হেসে শিশুটির নানি শিমা খাতুন বলেন, অল্পবয়সে মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিল। তখন মেনে নিইনি। এরপর মেয়ে যখন পাঁচ মাসের গর্ভবর্তি, তখন ধীরেধীরে মেনে নিছি। আজ শুভদিনে নাতনিকে পেয়ে খুব খুশি। এখন ওদের পূর্ণভাবে মেনে নিয়েছি। তবে সিজারিয়ান ঘরে নরমল ডেলিভারি হওয়ায় খুব খুশি। কারণ, নিজে সিজারের রোগী। সিজার করলে খুব কষ্ট হয়। মারিয়া খাতুন বলেন, সোমবার দুপুরে খাওয়ার পর হালকা করে ব্যথা শুরু হয়।

এরপর বিকেল ৪টার দিকে ব্যথা বেশি হয়। তবে আগে থেকেই নরমল ডেলিভারির ইচ্ছে ছিল বলে বাড়িতেই ছিলাম। কিন্তু এশার নামাজের সময় মনে হচ্ছিল আমার সাথে রোজকিয়ামত উঠে যাচ্ছে। তখন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলে তারা (চিকিৎসকরা) পরীক্ষা করে বলেন পজিশন ভালো আছে। কিন্তু সারারাতেও ডেলিভারি না হলেও বাড়তে থাকে যন্ত্রনা। এরপর সকালে বড় ভাবির পরামর্শে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্ত

নিই। তবে হাসপাতালে ডাক্তার না থাকায় ৮টার দিকে ক্লিনিকে ভর্তি হয়। সেখানেও ডাক্তার ছিলোনা। খুবই কষ্ট হচ্ছিল যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। পরে ১২টার দিকে ওটির রুমে প্রস্তুতি নিতে নিতেই নরমল ডেলিভারি হয়ে যায়। তখন খুব আনন্দ লাগছিল। মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখ তা মারিয়া আগে থেকেই জানতেন। তিনি বলেন, মেয়ে হওয়ার সাথেসাথেই ডাক্তার বললেন, আজ শুভ দিন। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। তাই মেয়ের

নাম রেখে দিলাম বৈশাখী। নামটাও ভালো। সেজন্য ডাক্তারের পছন্দমত নাম বৈশাখীই রেখেছি। এই নামেও সবাই খুশি। তাঁর ভাষ্য, ৯ মাস ১৩ দিন পর বৈশাখী জন্ম নিয়েছে। এতোদিন সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েছি। তিনি সনোর রিপোর্ট দেখে বলেছিলেন এপ্রিলের ২৩ তারিখ বাচ্চা হবে। তবে ডেটের আগেই বাচ্চা হয়েছে। এতে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, মা – বাবা, ভাই – ভাবি, প্রতিবেশী, ক্লিনিকের লোকজন সকলেই খুশি।

বিয়ের গল্প জানতে চাইলে মারিয়া বলেন, কুমারখালী ফাজিল মাদ্রাসায় ষষ্ট শ্রেণিতে পড়তাম। মাসুদ বাড়ির পাশে রাজমিস্ত্রির কাজ করার সময় বাড়িতে পানি খেতে এসেছিল। এরপর একদিন একটি চিঠি দিয়েছিল আমাকে। আমিও চিঠি একটা চিঠি দিছিলাম। এভাবে প্রেমের বয়স যখন দুই মাস, তখন মাসুদ আমার মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিছিল। মা রাজি না হলে দুজনে পালিয়ে মাসুদের খালাদের বাড়িতে উঠেছিলাম। পরে আমার শ্বশুর বাড়িতে ডেকে বিয়ে দিছিল। কিন্তু আমার মা – বাবা মেনে নিছিল না। যখন বৈশাখী ৫ মাসের পেটে। তখন আমার মা – বাবা আস্তে আস্তে মানতে থাকে। আর আজ পূর্ণভাবে মেনে নিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, মেয়ে বড় হয়ে কি করবে তা এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে ও (বৈশাখী) যতদুর পড়তে চাই, ততদুর পড়াবো। সবাই দোয়া করবেন আমাদের জন্য। মারিয়ার প্রসববেদনার প্রায় দীর্ঘ ২০ ঘণ্টা তাঁর পাশে ছিলেন স্বামী মাসুদ। তাই স্বজনদের ক্লিনিকে রেখে তিনি ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজবাড়িতে ঘুমাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন মারিয়া। সেজন্য শিশুটির বাবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পহেলা বৈশাখের দিন নতুন অতিথির আগমনে খুশি বৈশাখীর চাচাতো নানা আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ছুটির দিন হওয়ায় হাসপাতালে ডাক্তার ছিলোনা। আবার জরুরি ভাবে ক্লিনিকেও ডাক্তার ছিলোনা। তবুও নরমলভাবে বাচ্চা হওয়াতে সকলেই খুশি।

জানা গেছে, লোটাস হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক বিশ্বজিৎ বিশ্বাস। তাঁর ভাই প্রসেনজিৎ বিশ্বাস বলেন, সকালে পহেলা বৈশাখ বরণের প্রস্তুতি চলছিল। হঠাৎ খবর আসে অল্পবয়সি একজন প্রসূতি রোগীর। তখন নার্স ও ম্যানেজারের সঙ্গে আলাপ করে কুষ্টিয়া থেকে ডাক্তার এনে সিজারিয়ানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। ঠিক তখনই ওটিতে নরমল ডেলিভারি হয়। বৈশাখের প্রথমদিনে ক্লিনিকে নরমল ডেলিভারি হওয়ায় সবাই খুব খুশি। বাচ্চা ও মা দুজনেই সুস্থ আছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মোছা. শামিমা আক্তার মুঠোফোনে বলেন, ছুটির দিনে হাসপাতালে সিজারিয়ান ডাক্তার থাকেনা। তাছাড়া অফিসিয়াল সকাল ৮ টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত সিজারিয়ান করা হয়। হাসপাতালে জরুরী কোনো ব্যবস্থা নেই। সম্ভবত এসব জেনে লিখিত দিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন রোগী। তবে তাকে কোনো ক্লিনিকে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়নি।