বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আসন্ন ঈদুল ফিতর ও চলমান রমজানকে ঘিরে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে আলোচিত একটি ভেজাল গুড় প্রস্তুতকারী চক্র। একাধিকবার জরিমানা, কারাদণ্ড, কারখানা সিলগালা ও বিপুল পরিমাণ গুড় জব্দের পরও একই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন করে ভেজাল গুড় উৎপাদন ও বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনিক অভিযানের পর কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ঈদ-পূর্ব সময়ে গুড়ের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে চক্রটি আবারও পুরোদমে উৎপাদনে নেমেছে। এতে জনস্বাস্থ্য ও ভোক্তা নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আখের রস ছাড়াই চিটাগুড়, ময়দা, চিনি, পানি, ফিটকিরি, হাইড্রোজ, সোডা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে কথিত ‘দোজালি’ গুড়।
আকর্ষণীয় রং আনতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ের লাল রং। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপাদান মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দীর্ঘমেয়াদে লিভার, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা তৈরি হতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। ভেজাল গুড় প্রস্তুতের অভিযোগে গত কয়েক বছরে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে খোকসা বাজারের ‘দিলীপ ট্রেডার্স’ ও সংশ্লিষ্ট কারখানায়। ২০১৯ সালের ২৫ মে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কুষ্টিয়া কার্যালয়ের অভিযানে রাসায়নিক মিশিয়ে গুড় তৈরির প্রমাণ মেলে। ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯-এর ৪২ ও ৪৩ ধারায় ২ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৫ মণ অখাদ্য গুড় ধ্বংস করা হয়। ২০২০ সালের ৩০ এপ্রিল খোকসার কালীবাড়ি পাড়ায় অভিযানে দিলীপ কুমার বিশ্বাস ওরফে ষষ্ঠী, নিত্য গোপাল বিশ্বাসসহ তিনজনকে আটক করা হয়।
উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের গুড়, চিনি ও রাসায়নিক; বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়। ২০২১ সালের ১ আগস্ট র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ৫০০ বস্তা চিনি ও ক্ষতিকর রাসায়নিক জব্দ করে। ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর খোকসা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অভিযানে রাজকুমার বিশ্বাসকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ২০২৩ সালের ২২ মার্চ র্যাব-১২ ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে মেসার্স দিলীপ ট্রেডার্স ও নিত্য গোপাল গুড় কারখানা থেকে ৩২ হাজার ৭২৫ কেজি ভেজাল গুড় জব্দ এবং মোট ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
সবশেষ ২০২৫ সালের ৬ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুদীপ্ত রায় দ্বিপন খোকসা পৌর বাজারে অভিযান চালিয়ে ভেজাল আখের গুড় তৈরির প্রমাণ পান; কারখানা বন্ধ ঘোষণা ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ভারত থেকে আমদানিকৃত গো-খাদ্যের চিটা গুড়ের সঙ্গে চিনি ও সামান্য আখের গুড় মিশিয়ে তা বাজারজাত করা হতো। কারখানাটি খোকসা থানার অদূরেই অবস্থিত। তবুও একাধিকবার গ্রেপ্তার ও দণ্ডিত হওয়ার পরও কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি। সচেতন মহলের প্রশ্ন বারবার অভিযান ও সাজা সত্ত্বেও কীভাবে একই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুনরায় উৎপাদনে ফিরছে? স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঈদকে সামনে রেখে দিন-রাত শ্রমিক দিয়ে গুড় তৈরি করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর মতে, শুধু জরিমানা নয় স্থায়ীভাবে কারখানা উচ্ছেদ, লাইসেন্স বাতিল এবং কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভোক্তারাও ঈদ-পূর্ব সময়ে খোকসাসহ জেলাজুড়ে জোরদার অভিযান চালিয়ে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই অপরাধে বারবার ধরা পড়ার পরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় প্রশাসনের নজরদারি ও আইনি প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখন দেখার বিষয় ঈদের আগে প্রশাসন কতটা কঠোর অবস্থান নেয় এবং ভোক্তারা কতটা নিরাপদ খাদ্য পান।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সরেজমিনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক দিলীপ কুমার বিশ্বাস ওরফে ষষ্ঠীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমাদের গুড় সরকারিভাবে যতবার টেস্ট করা হয়েছে, ততবারই রিপোর্ট ভালো এসেছে। তাহলে একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত কেন পরিচালিত হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, গায়ের জোরে প্রশাসন অভিযান চালায় বলেই এসব হয়। এ বিষয়ে খোকসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমাদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ব্যবহৃত সরকারি মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
