নদীভাঙন এলাকায় বালুমহল ইজারা - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

নদীভাঙন এলাকায় বালুমহল ইজারা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ৭, ২০২৬

প্রশ্নের মুখে প্রশাসন

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের কোমরভোগ ও গণেশপুর এলাকায় নদীভাঙনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে বালুমহল ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়ে প্রশাসন জননিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গড়াই নদীর তীরবর্তী কোমরভোগ ও গণেশপুর এলাকায় অতীতে একাধিকবার ভয়াবহ নদীভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে কিছুটা সুরক্ষা দিলেও এখনো স্থায়ী কোনো বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।

এরই মধ্যে চলতি বাংলা বছরের শুরুতে এলাকাটি বালুমহল হিসেবে ইজারা দেওয়া হয়, যা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, ইজারাদার মনিরুল ইসলাম বালু উত্তোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জিও ব্যাগ কেটে যানবাহন চলাচলের রাস্তা তৈরি করেছেন, যা ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও তিনি দাবি করেছেন, আইন অনুযায়ী ইজারা নিয়ে কাজ করছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বালু উত্তোলন করবেন না। তবে জিও ব্যাগ কাটার বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

এলাকাবাসীরা জানান, নদীতীরবর্তী এলাকায় গয়েশপুর বাজার, একটি মাত্র খেলার মাঠ, মসজিদ ও মাদ্রাসাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। মাদ্রাসায় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এছাড়া অসংখ্য ভূমিহীন মানুষের বসবাস এই এলাকায়। তারা বলেন, দুই বছর আগে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়, যেখানে সরকার প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করে জিও ব্যাগ স্থাপন করে। এখন সেই বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিবর্তে এভাবে অপরিকল্পিতভাবে বালুমহল ইজারা দেওয়া জেলা প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্ত। দ্রুত এ সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে আমরা সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বো। এ বিষয়ে সহকারী ভূমি কমিশনার মোছা. তাসমিন জাহান বলেন, টেন্ডারের মৌজায় ‘কোমরভোগ’ নামটি অন্তর্ভুক্ত নয়। বিষয়টি জানার পর সেখানে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ইজারাদারকে সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, সংশ্লিষ্ট মৌজার নাম টেন্ডারে না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ওই এলাকায় ইজারা প্রদান করা হলো? এটি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, নাকি অন্য কোনো প্রভাব—তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, ইজারাদার মনিরুল ইসলামের কাছে থাকা একটি চিঠিতে কোমরভোগ ও গণেশপুর-এই দুটি স্থানের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, যার অনুলিপি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আরিফুল ইসলাম বলেন, গণেশপুর বালুমহল নিয়ম অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কোনোভাবেই বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হবে না। বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলাম জানান, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ইজারা বাতিল করা হতে পারে। এদিকে আসন্ন বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নদীভাঙনে বসতভিটা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এলাকাবাসীর জোর দাবি—অবিলম্বে বালু উত্তোলন বন্ধ করে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।