ছেলের স্মৃতি আমাকে প্রতিদিন কাঁদায়: আবরার ফাহাদের মা - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ছেলের স্মৃতি আমাকে প্রতিদিন কাঁদায়: আবরার ফাহাদের মা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: অক্টোবর ৮, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ফেসবুকে ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে খুন হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের শেরে বাংলা হলে তাকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গতকাল সোমবার (৭ অক্টোবর) আবরার ফাহাদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। পাঁচ বছর ধরে আবরারের বিভিন্ন স্মৃতি আঁকড়ে রেখেছে পরিবার। কান্না জড়িত কন্ঠে দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, আমার ছেলে বুয়েটে পড়াশোনা করতে গিয়েছিল।

সেখানে আমার ছেলেকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। আমার ছেলে যখন কাদছিল, তখন খুনিদের একটুও কষ্ট হয়নি। তারা নির্মম নৃশংসভাবে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। সেই মামলায় সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি আশা করেছিলাম। কিন্তু আদালত সবাইকে ফাঁসি দেননি। আইনের ওপর শ্রদ্ধা রেখে রায়ে আমরা সন্তোষ। তবে দ্রুত তাদের রায় কার্যকর করা হোক। সাজাপ্রাপ্ত তিন আসামি পলাতক রয়েছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছি। সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বুয়েট সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছিল অতীত সরকারের আমলে।

সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সেগুলোর বিরুদ্ধে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আমার ছেলেকে এভাবে চলে যেতে হতো না। আমার ছেলে আবরারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আবরারকে খুব কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ছেলের স্মৃতি আমাকে প্রতিদিন কাঁদায়। সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের দাবি জানাচ্ছি। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে সন্ত্রাসীমুক্ত করতে হবে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিরাপদ রাখতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখতে হবে। আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে আমার ছেলের মতো আর কেউ খুন না হোক।

আমি চাইনা আমার মত আর কোন মায়ের বুক খালি হোক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদে লেখাপড়া করে সবাই মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। সেই পরিবেশ তৈরি করা হোক দেশের সকল শিক্ষাঙ্গনে।  কথা হলে অশ্রুসিক্ত চোখ আবরারের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, পাঁচ বছর আগে এই দিনে ছেলেকে সকালে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়েছিলাম। বিকেলে বুয়েটে পৌঁছায়। এরপর তাকে ছাত্রলীগের ছেলেরা ডেকে রাতভোর নির্যাতন করে হত্যা করেছিল। তারা ছাত্রলীগ করলেও তারই কয়েকজন বন্ধু ছিল। তারাও একটি বারের জন্যও ফোনে জানায়নি ছেলে নিহত হওয়ার বিষয়ে। আবরারের মা শোকেস থেকে একটি ল্যাপটপ ও দুটি মোবাইল ফোন বের করে দুই হাতে নেড়েচেড়ে  স্মৃতিচারণ করতে করতে মা রোকেয়া খাতুন বলেন, এগুলো ছেলের। যত্নে রেখেছি আজও। সেগুলো আবারও শোকেসের ভেতরে রাখলেন। আজ যদি আমার ছেলে বেঁচে থাকত তাহলে চাকরি করত। আরও কত কী হতো।

স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন আরও বলেন, ছেলের আম্মু আম্মু ডাক এখনো কানে বাজে। ভুলতে পারি না। কীভাবে ভুলব? এই সন্তানকে ভোলার নয়। তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে সেটা মনে হলেই শিউরে উঠি। তার স্মৃতি নিয়েই বেঁচে আছি। আমার ছেলে আবরার তো চলে গেছে। আবরার কিভাবে চলে গেছে, সেটা হয়তো দুইএক প্রজন্ম জানবে। এরপর আবরারের নাম মুছে যেতে পারে। এটি যাতে মুছে না যায়। সেজন্য স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হোক। কারণ, সবাই যেন জানতে পারে কে আবরার। সবাই দোয়া করবেন। আবরার যেন জান্নাতবাসী হয়। উল্লেখ্য, আবরার ফাহাদ ১৩ মে ১৯৯৮ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রথমে কুষ্টিয়া মিশন স্কুল ও পরে জিলা স্কুলে লেখাপড়া শেষ করে ২০১৮ সালে ৩১ মার্চ তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হন। আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অসম চুক্তি এবং পানি আগ্রাসন নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের জেরে বুয়েটের শেরে বাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরারকে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নৃশংস কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করে সংগঠনটির ক্যাডাররা।

পরে রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দেশব্যাপী আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর ফুঁসে ওঠেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। দাবির প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্ররাজনীতি। পরে খবরে আসে, সেই ২০১১ নম্বর কক্ষটিকে ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করতো ছাত্রলীগ। সেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

সেই রুম থেকে নির্যাতনে ব্যবহৃত লাঠি, স্ট্যাম্প, রড, চাকু ও দড়ি উদ্ধার করেছিল ডিবি পুলিশ। এ ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। দায়ের করা হয় হত্যা মামলা। ওই মামলায় সব মিলিয়ে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।