গ্রাহকের কষ্টার্জিত টাকা পরিশোধ না করেই বন্ধের পথে দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থা! - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

গ্রাহকের কষ্টার্জিত টাকা পরিশোধ না করেই বন্ধের পথে দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থা!

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুন ৭, ২০২৬

কোটি কোটি টাকার আমানত ফেরত নিয়ে হাহাকার 

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া ইউনিয়নের নওদা খাদিমপুর গ্রামে অবস্থিত ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান “দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থা” এখন চরম আর্থিক সংকট, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকার আমানত ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দাউদার রহমান ও তার ভাতিজা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পলাশ আহমেদ এবং নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে অর্থ লুটপাট, আর্থিক অনিয়ম এবং গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয় সূত্র ও একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী আয়ভিত্তিক পরিবার এবং নিম্ন আয়ের মানুষজন লাভের আশায় ও নিরাপদ সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে টাকা জমা রাখেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সঞ্চয়ের টাকা ফেরত চাইতে গেলে নানা অজুহাতে মাসের পর মাস ঘুরানো হচ্ছে। কেউ টাকা চাইলে বলা হচ্ছে “আগামী সপ্তাহে আসেন”, আবার কাউকে সঞ্চয় হিসাব বন্ধের আবেদন করেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ভয়ভীতি ও হুমকি-ধামকির অভিযোগও উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, একসময় এলাকায় বেশ আস্থার জায়গা তৈরি করলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত ধসে পড়ার পথে। আর্থিক সংকট এতটাই প্রকট হয়েছে যে, গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে কয়েকশ পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। মিরপুর উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ আব্দুল হালিম অভিযোগ করেন, বিদেশে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কেনা জমি বিক্রি করে পাওয়া সম্পূর্ণ অর্থ তিনি দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থায় জমা রাখেন। কিন্তু প্রায় আড়াই বছর ধরে সেই টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, “বিদেশে কষ্ট করে উপার্জিত টাকা দিয়ে জমি কিনেছিলাম। পরে জমি বিক্রি করে পুরো টাকা সংস্থায় রাখি। কিন্তু আজ প্রায় আড়াই বছর ধরে শুধু ঘুরাচ্ছে। কোনো সমাধান নেই, টাকা ফেরতও দিচ্ছে না।” আব্দুল হালিম আরও অভিযোগ করেন, সম্প্রতি তার ছেলে পাওনা টাকা চাইতে চেয়ারম্যান দাউদের বাড়িতে গেলে চেয়ারম্যানের ভাতিজা তাকে মারধর ও গালাগালি করেন। যদিও থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়নি, তবে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা হয়েছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, “এখন আর্থিকভাবে আমি খুব খারাপ অবস্থায় আছি। নিজের টাকাই ফেরত পাচ্ছি না। যারা এই অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিচার হওয়া দরকার।”

একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থাতে ১০ কোটি টাকারও বেশি গ্রাহকদের আমানত ছিল। তবে পরিচালনা পরিষদের সভাপতি, নির্বাহী পরিচালক এবং চেয়ারম্যানের ভাতিজা ব্যাংক কর্মকর্তা পলাশ আহমেদের নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক দুর্নীতির কারণে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের তহবিল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সূত্রটি জানায়, প্রতিষ্ঠানটির নামে কেনা প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের জমি মর্টগেজ রেখে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন চেয়ারম্যান দাউদার রহমান। কিন্তু গ্রাহকদের বিপুল অঙ্কের পাওনার তুলনায় এই অর্থ একেবারেই অপ্রতুল।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটি মাঠপর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও শতাধিক গ্রাহকের কাছে দেওয়া ঋণের টাকা আদায়ে সংকট তৈরি হয়েছে। আর্থিক দুরবস্থার কারণে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করা যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংক ঋণ মিললেও সব গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর তা হলে হাজারো গ্রাহকের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পাওয়া আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল কর্মকর্তা মোহাম্মদ পলাশ আহমেদ, যিনি চেয়ারম্যান দাউদার রহমানের ভাইয়ের ছেলে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার করে অনিয়মে জড়িত ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম ও অর্থ সরিয়ে নেওয়ার কাজে সহযোগিতা করেছেন। এমনকি অর্থ লুটপাটের সুবিধাভোগী হিসেবেও তার নাম স্থানীয়দের আলোচনায় রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, মিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হালিমের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিষ্ঠানটির অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত প্রমাণ দেখাতে পারেননি অভিযোগকারীরা। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১৫ বছর আগে একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন মোহাম্মদ দাউদার রহমান।

পরে দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুক্ত হন। এলাকাবাসীর দাবি, মাত্র দেড় যুগের ব্যবধানে তিনি কুষ্টিয়া শহরসহ বিভিন্ন স্থানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বহুতল ভবন, জমিজমা ও বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে এলাকাজুড়ে চলছে নানা আলোচনা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির নিবার্হী পরিচালক আহসান হাবিব একটি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। অধিক লাভের আশায় গোপনে এখানে দায়িত্ব পালন করতেন।

তার স্ত্রীও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের সাথে জড়িত। দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবিব বলেন, প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে চেয়ারম্যান নিজেই পরিচালনা করতেন। এখানে কোনো স্থায়ী ম্যানেজার, হিসাবরক্ষক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কার্যকরভাবে নিয়োজিত ছিলেন না। গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন হিসাবে সংরক্ষণ করা হতো, সে বিষয়ে চেয়ারম্যানই একমাত্র অবগত ছিলেন। তিনি কখনো নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে, কখনো হাতে নগদ অর্থ রেখে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলে আমার ধারণা। যদিও আমি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক পদে দায়িত্বে ছিলাম, বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের কোনো নির্বাহী বা আর্থিক ক্ষমতা আমার হাতে ছিল না। আমার ভূমিকা ছিল মূলত নামমাত্র এবং কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ।

চেয়ারম্যান প্রায়ই আমাকে বলতেন, ‘তুমি বাইরে বাইরে থাকো, অফিসের বিষয় নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। সবকিছু আমি দেখছি এবং আমিই পরিচালনা করব। কোথাও স্বাক্ষরের প্রয়োজন হলে আমি জানাব, তখন তুমি শুধু স্বাক্ষর করে দেবে। এ প্রসঙ্গে সংস্থার চেয়ারম্যানের ভাতিজা মোহাম্মদ পলাশ আহমেদ সকল অভিযোগ অস্বীকার করলেও তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি তিনি কোন ভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেনি। অভিযোগের বিষয়ে দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দাউদার রহমান বলেন, “আমাদের কাছে প্রায় ৫ কোটি টাকার গ্রাহক সঞ্চয় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা জমি মর্টগেজ রেখে এক কোটি টাকা ঋণের চেষ্টা করছি। ঢাকায় কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে কথা চলছে।

ঋণ পেলে সমস্যার সমাধান হবে।” তবে গ্রাহকদের পাওনা অর্থের তুলনায় মাত্র এক কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কীভাবে পরিস্থিতির সমাধান হবে-এমন প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। দিনের পর দিন অপেক্ষা, প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে গ্রাহকদের মনে। জীবনের সঞ্চয় কি আর কখনো ফেরত পাওয়া যাবে? অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অনিয়ম, আমানত ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের জরুরি তদন্ত প্রয়োজন। দীপিকা সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের বক্তব্য, চেয়ারম্যানের ভাতিজা ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ পলাশের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র এবং লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।