গড়াই তীরের তামাক বিপ্লব: ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও কুষ্টিয়ার একশ বছর - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

গড়াই তীরের তামাক বিপ্লব: ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও কুষ্টিয়ার একশ বছর

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার কুষ্টিয়া জেলা কেবল শিল্প-সংস্কৃতির চারণভূমি নয়, বরং এটি দেশের ‘তামাক রাজধানী’ হিসেবেও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এই বিশেষ পরিচিতির নেপথ্যে যে নামটি গত এক শতাব্দী ধরে মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে আছে, সেটি হলো ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (BATB)। ১৯১০-এর দশকে অবিভক্ত ভারতে কোম্পানিটি যখন তাদের বাণিজ্যিক অগ্রযাত্রা শুরু করে, তখন থেকেই কুষ্টিয়া ছিল তাদের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গড়াই ও পদ্মা বিধৌত এই জনপদের পলিমাটির ঘ্রাণে মিশে আছে তামাকের এক দীর্ঘ ইতিহাস, যা বিবর্তিত হয়েছে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে নয়, বরং এই মাটির এক অনন্য ভৌগোলিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও কুষ্টিয়া

১. সূচনালগ্ন ও ভৌগোলিক গুরুত্ব

কুষ্টিয়ায় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) জয়যাত্রা কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল এই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতির সাথে বিশ্বখ্যাত তামাকের এক অনন্য মেলবন্ধন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, ব্রিটিশ শাসনামলে যখন বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক কৃষির পুনর্গঠন চলছিল, তখন কৃষি-গবেষকরা লক্ষ্য করেন যে গঙ্গা ও গড়াই অববাহিকার বিশাল চরাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন নদীয়া (যার বড় অংশ বর্তমানে কুষ্টিয়া) জেলার মাটি তামাকের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এই অঞ্চলের পলি-সমৃদ্ধ বেলে-দোঁআশ মাটিতে নাইট্রোজেন ও পটাশিয়ামের এমন এক প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিদ্যমান, যা উচ্চমানের ‘ভার্জিনিয়া ফ্লু-কিউর্ড’ তামাক চাষের জন্য অপরিহার্য।

বিশেষ করে শুষ্ক শীতকালীন আবহাওয়া এবং ভোরের কুয়াশা তামাকের পাতায় এক ধরনের বিশেষ তৈলাক্ততা ও সুগন্ধ (Aroma) তৈরি করে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত সমাদৃত। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর ভৌগোলিক সীমানা বদলে গেলেও কুষ্টিয়ার এই উর্বর ভূমির গুরুত্ব কমেনি। বরং পূর্ব পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বিএটি এই অঞ্চলের চাষাবাদকে আরও সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। তারা প্রান্তিক কৃষকদের আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও উচ্চফলনশীল বীজের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা কুষ্টিয়াকে সাধারণ কৃষিনির্ভর জনপদ থেকে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক কৃষি-শিল্পের কেন্দ্রে (Agro-Industrial Hub) রূপান্তরিত করে। এই সংগঠিত প্রচেষ্টাই পরবর্তীতে কুষ্টিয়াকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তামাক উৎপাদনের একক বৃহত্তম শক্তিকেন্দ্রে পরিণত করেছিল।

২. শিল্পায়ন ও বিএটি-র কারখানা স্থাপন

কুষ্টিয়ার শিল্পায়নের ইতিহাসে ১৯৫৪ সাল একটি স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত, যখন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) কুষ্টিয়া শহরের উপকণ্ঠে তাদের বিশাল লিফ প্রসেসিং প্ল্যান্ট (LPP) স্থাপন করে। এটি কেবল একটি কারখানা ছিল না, বরং ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ ও আধুনিক শিল্প অবকাঠামো। এই কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কুষ্টিয়া একটি নিছক কৃষিপ্রধান জনপদ থেকে দ্রুত শিল্পনগরীর দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। বিশাল আয়তনের এই প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে মাঠ থেকে সংগৃহীত তামাক পাতাকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে বাছাই, গ্রেডিং এবং পুন-আর্দ্রকরণ (Re-drying) করে আন্তর্জাতিক মানের উপযোগী করে তোলা হতো।

বিশাল কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনবল:

এই কারখানাকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ায় এক বিশাল কর্মসংস্থানের বাজার তৈরি হয়। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিএটি যে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার প্রবর্তন করে, তা স্থানীয় পর্যায়ে একটি দক্ষ ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কফোর্স’ বা শিল্প-শ্রমিক গোষ্ঠী তৈরি করে। এর ফলে কুষ্টিয়ার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হয়।

অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন:

কারখানা এলাকাকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। বিশাল আকৃতির গুদামঘর (Bonded Warehouse), উন্নত মানের অফিসার্স কোয়ার্টার এবং সুপরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে, যা তৎকালীন সময়ে আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন ছিল। তামাক পাতা পরিবহনের প্রয়োজনে কুষ্টিয়ার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে এবং রেলওয়ে ওয়াগনের মাধ্যমে তামাক পরিবহনের ফলে স্থানীয় স্টেশনের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন কেবল বিএটি-র ব্যবসার প্রসার ঘটায়নি, বরং পুরো কুষ্টিয়া শহরের নগরায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব:

বিএটি-র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আবাসন ও ক্লাব সংস্কৃতি কুষ্টিয়ার সামাজিক জীবনে এক নতুন আভিজাত্যের ছোঁয়া এনে দেয়। শিল্প ও সংস্কৃতির শহর কুষ্টিয়ায় এই আধুনিক কর্পোরেট কালচার স্থানীয় শিক্ষা ও মননশীলতায় এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। ফলে বিএটি-র এই লিফ প্রসেসিং প্ল্যান্টটি কুষ্টিয়ার অর্থনীতির হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়, যা আজও এই অঞ্চলের শিল্প পরিচয়ের প্রধানতম স্তম্ভ হিসেবে টিকে আছে।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও কুষ্টিয়া

 

৩. কৃষি বিপ্লব ও কন্ট্রাক্ট ফার্মিং (চুক্তিভিত্তিক চাষ)

কুষ্টিয়ার কৃষি ইতিহাসে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এনেছে, তা হলো আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘চুক্তিভিত্তিক চাষ’ বা Contract Farming মডেলের সফল প্রবর্তন। প্রথাগত অনিশ্চিত কৃষিব্যবস্থার বিপরীতে এটি ছিল একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও লাভজনক বাণিজ্যিক মডেল। এই পদ্ধতির আওতায় বিএটি সরাসরি কৃষকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়, যেখানে ফসল বোনার আগে থেকেই কৃষকের মুনাফা ও বাজারের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা হয়। এটি কুষ্টিয়ার প্রান্তিক কৃষকদের এক আমূল রূপান্তরের পথে নিয়ে যায়, যা মূলত একটি কৃষি বিপ্লবের সূচনা করে।

এই মডেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কৃষকের দোরগোড়ায় সরাসরি ইনপুট পৌঁছানো। কোম্পানিটি কৃষকদের শুধু উচ্চফলনশীল বীজই দেয় না, বরং প্রয়োজনীয় সার, কীটনাশক এবং তামাক শুকানোর (Curing) জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কয়লা সরাসরি সরবরাহ করে। এর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে বিএটি-র প্রশিক্ষিত লিফ অফিসার ও টেকনিশিয়ানরা নিয়মিত কৃষকদের কারিগরি পরামর্শ দেন, যা তামাকের গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে সহায়তা করে। ফসল কাটার পর কৃষকদের কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থ হতে হয় না; তারা সরাসরি বিএটি-র নির্ধারিত ডিপোগুলোতে তামাক পাতা বিক্রি করার ১০০% নিশ্চয়তা পায়।

এর ফলে কুষ্টিয়ার মিরপুর, ভেড়ামারা এবং দৌলতপুর উপজেলার কৃষি অর্থনীতি পুরোপুরি তামাক-কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। এক সময়কার অবহেলিত এই চরাঞ্চল ও সমতল ভূমিগুলো আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের চাষিরা এখন কেবল কৃষক নন, বরং তারা একেকজন বাণিজ্যিক উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তামাকের এই ক্যাশ-ফ্লো বা নগদ টাকার সরবরাহ স্থানীয় ছোট ও মাঝারি ব্যবসা, পরিবহন খাত এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নেও পরোক্ষভাবে বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। তামাক চাষ কুষ্টিয়ার এই নির্দিষ্ট উপজেলাগুলোকে দেশের অন্যতম প্রধান ‘হাই-ভ্যালু’ কৃষি অঞ্চলে পরিণত করেছে।

৪. কুষ্টিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব

কুষ্টিয়া জেলার অভ্যন্তরীণ জিডিপি (Gross District Product) এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণে তামাক শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। কয়েক দশক ধরে কুষ্টিয়ার কৃষি ও শিল্প খাতের যে সংমিশ্রণ ঘটেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি)। কোম্পানিটির কার্যক্রম কেবল পাতা কেনা-বেচায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি কুষ্টিয়াকে দেশের অন্যতম প্রধান ‘রাজস্ব জোগানদাতা’ জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতি বছর বিএটি বাংলাদেশ সরকারকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক প্রদান করে, তার একটি সিংহভাগ উৎস হলো কুষ্টিয়ার উর্বর জমিতে উৎপাদিত এই উচ্চমানের তামাক। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব জাতীয় অর্থনীতিতে যেমন অবদান রাখছে, তেমনি স্থানীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নেও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলছে।

কুষ্টিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্রটি বদলে গেছে এখানকার তামাক-নির্ভর ‘সহায়ক ব্যবসা’ বা এন্সিলারি ইন্ডাস্ট্রির (Ancillary Industry) প্রসারের মাধ্যমে। তামাক পাতা শুকানোর জন্য হাজার হাজার আধুনিক চুল্লি বা ‘বার্ন’ (Barn) তৈরির ফলে গ্রামীণ পর্যায়ে নির্মাণ ও কারিগরি শিল্পের এক নতুন বাজার তৈরি হয়েছে। তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা পরিবহন, বাঁশের মাচা তৈরি এবং বিশেষায়িত প্যাকিং শিল্পের অভাবনীয় প্রসারের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। এই চেইন রিঅ্যাকশনের ফলে কুষ্টিয়ার মিরপুর বা দৌলতপুরের মতো এলাকায় নগদ টাকার প্রবাহ (Liquidity) দেশের অন্যান্য অনেক কৃষি অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। পরিবহন খাতে শত শত ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান নিয়োজিত থাকায় স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের জন্য সারা বছর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মূলত বিএটি-কে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ায় যে শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠেছে, তা এই জেলার অর্থনীতিকে এক অনন্য উচ্চতা ও স্থিতিশীলতা দান করেছে।

 

৫. সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও কুষ্টিয়ার এই দীর্ঘ পথচলার যেমন উজ্জ্বল অর্থনৈতিক সাফল্য রয়েছে, তেমনি এর সমান্তরালে তৈরি হয়েছে কিছু গভীর সামাজিক ও পরিবেশগত উদ্বেগ। কুষ্টিয়ার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর তামাক শিল্পের প্রভাব বর্তমানে এক বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তামাক চাষের সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতিবাচক প্রভাবটি হলো তামাক পাতা শুকানোর প্রক্রিয়া বা ‘কিউরিং’। তামাক পাতাকে সোনালি রঙ ও নির্দিষ্ট মানে পৌঁছাতে হাজার হাজার চুল্লিতে (Barns) দিনরাত আগুন জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এই চুল্লিগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঠ পোড়াতে হয়, যার ফলে কুষ্টিয়ার সামাজিক বনায়ন এবং গ্রামীণ বনভূমি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বন উজাড়ের এই প্রক্রিয়ায় যেমন জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে স্থানীয় তাপমাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলছে।

পরিবেশের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন কুষ্টিয়ার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। তামাক চাষে বিএটি-র নিশ্চিত বাজার ও নগদ অর্থের প্রলোভন কৃষকদের প্রথাগত ফসল যেমন—ধান, পাট, ডাল বা তৈলবীজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা তাদের সেরা উর্বর জমিগুলো তামাক চাষে নিয়োজিত করছে, যা এই অঞ্চলে খাদ্য শস্যের বৈচিত্র্য ও আবাদি জমির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা স্থানীয় খাদ্য স্বয়ম্ভরতাকে দুর্বল করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া তামাকের জমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করে দিচ্ছে, যা অন্য কোনো ফসল চাষের জন্য মাটিকে অনুপযোগী করে তুলছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে জড়িত মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। তামাক চাষের শুরু থেকে পাতা বাছাই এবং প্রসেসিং প্ল্যান্টের ধুলিকণা ও তামাকের কড়া গন্ধের মধ্যে কাজ করার ফলে শ্রমিক ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা এবং দীর্ঘস্থায়ী চর্মরোগের প্রকোপ দেখা যায়। বিশেষ করে ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ (GTS) এর মতো সমস্যাগুলো এই অঞ্চলের কৃষকদের স্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঘাতক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এলেও, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং সুস্থ জনপদ নিশ্চিত করা এখন কুষ্টিয়ার জন্য একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

৬. বিএটি-র সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR)

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) কেবল ব্যবসায়িক মুনাফার দিকেই নজর দেয়নি, বরং ইতিহাসের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়ার সামাজিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণমূলক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কোম্পানির ‘কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’ (CSR) কার্যক্রমের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পরিবেশের ক্ষতিপূরণ ও জনকল্যাণ। তামাক পাতা শুকানোর ফলে সৃষ্ট বন উজাড়ের ঝুঁকি কমাতে বিএটি ১৯৮০-এর দশক থেকে দেশে অন্যতম বৃহত্তম বেসরকারি বনায়ন কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। কুষ্টিয়ার প্রতিটি তামাক উৎপাদনকারী অঞ্চলে তারা প্রতি বছর ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের লক্ষ লক্ষ চারা বিনামূল্যে বিতরণ করে। এই বনায়ন উদ্যোগের ফলে কুষ্টিয়ার অনেক ন্যাড়া এলাকা পুনরায় সবুজে ভরে উঠেছে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নেও বিএটি কুষ্টিয়ার গ্রামগুলোতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। কুষ্টিয়ার অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের প্রাদুর্ভাব একটি বড় সমস্যা। এই সংকট মোকাবিলায় কোম্পানিটি ‘প্রবাহ’ (Probaho) প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন ইউনিয়নে অত্যাধুনিক আর্সেনিকমুক্ত ও বিশুদ্ধ পানির ফিল্টারিং প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ রোগমুক্ত ও নিরাপদ পানির সুবিধা পাচ্ছে, যা গ্রামীণ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।

আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রবর্তনেও বিএটি-র অবদান অনস্বীকার্য। কুষ্টিয়ার কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ উৎসাহিত করতে কোম্পানিটি সোলার চালিত সেচ পাম্প (Solar Irrigation) স্থাপন শুরু করেছে। প্রচলিত ডিজেল চালিত পাম্পের বদলে সৌরশক্তি ব্যবহার করার ফলে যেমন কৃষকদের সেচ খরচ সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাচ্ছে। এই উদ্ভাবনী সেচ ব্যবস্থা ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কুষ্টিয়ার কৃষকরা ধীরে ধীরে আরও আধুনিক ও পরিবেশ সচেতন হয়ে উঠছেন। বিএটি-র এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো একদিকে যেমন তাদের ব্যবসায়িক ভিত্তি মজবুত করেছে, অন্যদিকে কুষ্টিয়ার প্রান্তিক জনপদের জীবনমান উন্নয়নেও এক ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে।

 

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও কুষ্টিয়া

 

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও কুষ্টিয়ার সম্পর্কটি কেবল ব্যবসা ও শ্রমিকের নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বিবর্তনের গল্প। একদিকে যেমন এটি কুষ্টিয়াকে একটি শক্তিশালী শিল্প ভিত্তি দিয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও কৃষিবৈচিত্র্যের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গত ৭০ বছরে কুষ্টিয়ার মধ্যবিত্ত সমাজ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিএটি-র এক বিশাল ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।