কৃষিকে চোখ রাঙাচ্ছে জ্বালানী তেল - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কৃষিকে চোখ রাঙাচ্ছে জ্বালানী তেল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ৯, ২০২৬

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ এখন আধুনিক কৃষিকাজ। জমিচাষ, ধান লাগানো,সেচ, কাঁটা, মাড়াই সব কাজই আধুনিক যন্ত্র দিয়ে করা হয়। আর যন্ত্র চালাতে হলি তেল লাগবি। সেই তেলটা ছাড়া আমরা তো কৃষি কাজ করতে পারতিছি না। এহন পাম্ম থেকে আমাদের তেল দেওয়া হচ্ছেনা। সেজন্য মেশিন নিয়ে কৃষি অফিসে আইছি। দেখি উনারা কি বলে।

সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যায়ের সামনে ভ্যানগাড়ি থেকে একটি মিনি সেচ যন্ত্র নামানোর সময় একবুক হতাশা নিয়ে কথা গুলো বলছিলেন কৃষক মনিরুল ইসলাম। তিনি কুমারখালী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড দুর্গাপুর গ্রামের মসলেম উদ্দিনের ছেলে। মনিরুলের ভাষ্য, সেচের মিনি যন্ত্রটি পেট্রল ছাড়া চলেনা। মাঠে তাঁর প্রায় ২১ বিঘা জমিতে বোরো ধান আছে।

৩ বিঘা জমিতে ভূট্টা আছে। ধান ফোলা শুরু করেছে (শীষ বের হচ্ছে)। এখন পানি না দিলে ফলন হবেনা। বড় ধরনের লোকশান হবে। পাম্ম মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষি কর্মকর্তার ছাড়পত্র নিতে এসেছেন তিনি। উপজেলার সদকী ইউনিয়নের হুদা গ্রামের মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে আশরাফুল আলম (৫০)। তাঁর একটি ডিজেল চালিত পাওয়ার টিলার মেশিন আছে। তিনি নিজের আড়াই বিঘা জমিতে চাষাবাদের পাশাপাশি অন্যের জমি চাষ দেওয়ার কাজ করে সংসার চালান। স্ত্রী, দুই মেয়েসহ চার জনের সংসার তাঁর।

দুপুরে হুদা গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, একটি জমিতে কয়েক পাক চাষ দেওয়া হয়েছে। থেমে থাকা পাওয়ার টিলার মেশিনটি বারবার চালু করার চেষ্টা করছেন। এ সময় আশরাফুল বলেন, এই গাড়ি চালাইয়া আমার দিনপাত চলে। এখন পাটের জন্য চাষ মারা হচ্ছে। দুইপাক নাই ঘুরতি তেল ফুরো গেছে। একদিন পরপর ৫ লিটার তেল দেয়। তাও আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়া থাকতি হয়। এভাবে কি চাষবাদ করা যায়।

তাঁর ভাষ্য, ৫ লিটার তেলে প্রায় দেড় বিঘা জমি চাষ করা যায়। প্রতিদিন অন্তত ১৫ লিটার তেল লাগে তাঁর টিলারে। তিনি পর্যাপ্ত তেলের ব্যবস্থা করার দাবি জানান। একই মাঠের কৃষক কাউসার আলী (৪৫)। চার বিঘা জমি আছে তার। তিনি আধুনিক যন্ত্র ট্রাক্টর, সেচ পাম্ম, কম্বাইন্ড হারভেস্টরের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল জাত চাষ করেন। তিনি বলেন, দুই হাজার সালের আগেও গরুর নাঙল দিয়ে চাষ করতাম। এখন সবকিছুই যান্ত্রিক।

এতে কষ্ট কম, ফলনও ভালো হয়। তবে মাসখানেক হলো তেলের জন্য ঠিকঠাক চাষ করা যাচ্ছেনা। তেলের ব্যবস্থা না হলে চাষবাদ বন্ধ হয়ে যাবে।  তাঁর ভাষ্য, গরুর নাঙলের চাষ করে চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় জানায়, চলতি মৌসুমে (খরিপ -১) উপজেলায় ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে হরেকরকম চাষবাদ চলছে। তারমধ্যে বোরোধান ৫ হাজার ৬৫০ হেক্টর, পাট ৪ হাজার ৮৭৮, ভূট্টা ৪৪০, তিল এক হাজার ৯২০, চিনাবাদাম ৬, মুগডাল ২০, মরিচ ১১৫, আদা ১০৭, হলুদ ১১৫, শাক সবজি ৭৫০ ও আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে ৬ হাজার ২৬৫ হেক্টর।

এখানে জমি চাষ ও সেচ দেওয়ার কাজ চলে শতভাগ আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে। ৯০ ভাগ জমির ফসল মাড়াই ও ২ ভাগ জমিতে স্প্রে ছিটানোর কাজও চলে তেল চালিত যন্ত্রের সাহায্যে। এখানে চাষের জন্য এক হাজার ৪৬৫ টি টিলার ও ৩২টি ট্রাক্টর রয়েছে। যার একমাত্র চালিকা শক্তি জ্বালানী তেল ডিজেল। সেচের জন্য ৬০ ভাগ যন্ত্র রয়েছে বৈদ্যুতিক। আর বাকী ৪০ ভাগ চলে ডিজেল ও পেট্রল চালিত যন্ত্রে। অকটেন চালিত স্প্রে মেশিন রয়েছে ৩২ টি। ডিজেল চালিত মাড়াই যন্ত্র ৪২ এবং কম্বাইন্ড হারভেস্টর রয়েছে ২১ টি। এসব যন্ত্রের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার লিটার জ্বালানী তেলের প্রয়োজন।

কিন্তু তেলের কৃত্রিম সংকটে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চাষাবাদ। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামত তেল পাচ্ছেন না কৃষকরা। দুই হাজার সাল থেকে উপজেলায় চলছে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ। এতে অল্প শ্রম ও সময়ে অধিক ফলন হয় বলে দাবি কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের। তবে চাহিদামত তেল না পাওয়ায় হুমকিতে পড়েছে এখানকার আধুনিক ও যান্ত্রিক চাষাবাদ। ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা। তখনও শিপলু ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য প্লাস্টিকের ড্রাম ও বোতল হাতে অন্তত শতাধিক কৃষক লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

সেখানে জনপ্রতি ৫০০ টাকার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। গত রোববার কুমারখালীর এই পাম্পটিতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। অথচ সেসময় তাঁদের থাকার কথা কৃষিজমিতে। এ সময় নন্দলালপুর ইউনিয়নের এলংগী গ্রামের মৃত তক্কেল শাহের ছেলে সাইফুর রহমান (৫৬) বলেন, আমি টিলার মেশিন চালায়। এখন পাট বুনার সময়। প্রতিদিন ১০-১২ লিটার তেল দরকার। কিন্তু দেচ্ছে তো পাঁচটা করে। কতটুক ভুই ( জমি) চষা যায় কন? এই দিয়ে কি ভুই চষা হয়। কয়া ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার রেজাউলের ছেলে জীবন হাসান বলেন, বড় গাড়িতে (ট্রাক্টর) মাঠে চাষ করি। দিনে ৬০ – ৭০ লিটার করে তেল লাগে। দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৫০০ টাকার তেল পালাম।

এভাবে কিম্বা করি করব। তেলের এই মহাসংকট যেন তাড়াতাড়ি দুর করে সরকার। পুরাতন চড়াইকোল এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক কিতাব শেখ আক্ষেপ করে বলেন,  ইরি ধানের জমি শুকো যাচ্ছে। সেলোতে পানি দিব। সাত লিটার তেল লাগবি। তিনঘণ্টা লাইনে থাকে ৫০০ টাকার তেল পালাম। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা জন কামই করে দাঁড়া থাকেও ফিরে যাতি হয়। যেমন ভাব, তাতেতো চাষ বন্ধ করে দেওয়া লাগবিনি। সংকটের আগের মত তেল পাওয়া যাচ্ছেনা বলে জানিয়েছেন শিপলু ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক আব্দুল করিম। তিনি বলেন, আতঙ্কে একই কৃষক একাধিকবার তেল নিচ্ছেন। জনপ্রতি ৫০০ থেকে এক হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে সপ্তাহে তিনদিন।

প্রতিদিন তেলের চাহিদা ২০ হাজার লিটার। আর পাচ্ছি ৬ হাজার লিটার। তাঁর ভাষ্য, সংকটের আগে প্রতিমাসে ডিজেল এক লাখ ৩০ হাজার, পেট্রল ৬০ হাজার ও অকটেন ৩০ হাজার লিটার তেল পাওয়া যাচ্ছে। সরেজমিন, উপজেলার সদকী, জগন্নাথপুর, নন্দলালপুর, চাপড়া, যদুবয়রা, বাগুলাট, চাঁদপুর ও পান্টি ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, পেঁয়াজ তোলার কাজ প্রায় শেষ। পাটের চাষাবাদ চলছে। শোভা পাচ্ছে ধান, ভূট্টা, কলা, বেগুন, মরিচসহ হরেক ফসল। হারভেস্টরের মাধ্যমে চলছে গম কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। টিলার ও ট্রাক্টর দিয়ে চলছে জমিচাষ। সেলোইঞ্জিন ও বিদ্যুতিক পদ্ধতিতে থেমেথেমে চলছে সেচের কাজ।

যদুবয়রা ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের কৃষক চঞ্চল শেখ বলেন, তিনটা কম্বাইন্ড হারভেস্টর মেশিনে গম মাড়াইয়ের কাজ চলছে। গাড়িপ্রতি ৭০ – ৮০ লিটার তেল পেলে আট একর জমিতে কাজ করা যায়। কিন্তু ৫০০ টাকার তেল দিচ্ছে। কদিন পর ধান কাটা শুরু হবে। খুব চিন্তায় আছি। তাঁর ভাষ্য, ঈদের আগে ৫-৭ জন লোক ভাড়া করে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল মজুদ করেছিলেন তিনি।

তা দিয়েই চলছে। চাপড়া ইউনিয়নের সাঁওতা গ্রামের খন্দার খাদিমুল ইসলামের কৃষক ছেলে রফিকুল ইসলাম বলেন, সাত বিঘা জমি আছে। তেল না পেলে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে। জমি পতিত থাকবে। দ্রুত তেল অথবা বিকল্প ব্যবস্থা করুক সরকার। কুমারখালীর বাহার কৃষি কলেজের অধ্যক্ষ কৃষিবিদ মোহা. নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, আধুনিক কৃষি সম্পূর্ণ যন্ত্র ও তেল নির্ভর। বৈশ্বিক কারণে তেলের সংকট চলছে। থমকে গেছে কৃষি।

আধুনিক কৃষিকে ঠিকিয়ে রাখতে এখনই তেলের বিকল্প ভাবতে হবে। যন্ত্রগুলোকে তেলের পাশাপাশি সৌরশক্তি বা ব্যাটারী চালিত করতে হবে। অন্যথায় আধুনিক কৃষি থমকে গেলে খাদ্যশস্যসহ চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে দেশ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, এখানকার কৃষি আধুনিক ও যান্ত্রিক। যন্ত্রগুলো তেলের ওপর নির্ভরশীল। জমিচাষ, সেচ, মাড়াই ও স্প্রের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার লিটার তেলের চাহিদা রয়েছে। চাহিদা মেটাতে প্রশাসনের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, তেল ছাড়া যান্ত্রিক কৃষি অচল।

উপজেলা প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, কুমারখালীতে শিপলু, গাজী ও মজিবর রহমান নামের তিনটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। গত সাতদিনে পদ্মা ও যমুনা ডিপো থেকে ডিজেল প্রায় ৮৮ হাজার, পেট্রল ২৩ হাজার ও অকটেন ৬ হাজার লিটার গ্রহণ ও ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। কৃষিযন্ত্র ছাড়াও অসংখ্য মোটরসাইকেল, ট্রাক, সেলোইঞ্জিন চালিত বিভিন্ন যানবহনে তেল দেওয়া হচ্ছে। তবে তেলের সঠিক চাহিদা ও যানবাহনের সংখ্যা জানা যায়নি।

ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, তেলের সংকটটা বৈশ্বিক। তবুও কৃষিকাজসহ জরুরী প্রয়োজনে বরাদ্দ প্রাপ্ত অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের মাঝে তেল মজুদের প্রবানতা দেখা গেছে। এটা প্রতিরোধে প্রশাসন কাজ করেছে।