কুষ্টিয়া জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অনন্য প্রশাসনিক অঞ্চল, যা তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, শিল্প-সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। নিচে জেলাটির মানচিত্র ও এর পারিপার্শ্বিকতার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো।
কুষ্টিয়া জেলার মোট আয়তন ১,৬২১.১৫ বর্গকিলোমিটার। মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, এর চারপাশ ঘিরে রয়েছে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জেলা এবং প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত:
উত্তরে: রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা।
দক্ষিণে: চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলা।
পূর্বে: রাজবাড়ী জেলা।
পশ্চিমে: মেহেরপুর জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদীয়ার সীমান্ত।
কুষ্টিয়ার মানচিত্রকে জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে এর নদ-নদী। মূলত পদ্মা ও গড়াই নদীর পলি দিয়েই এই অঞ্চলের গঠন। প্রধান নদীগুলো হলো:
পদ্মা নদী: যা জেলার উত্তর সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত।
গড়াই নদী: কুষ্টিয়া শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা এই নদীটি জেলার প্রাণ।
অন্যান্য নদী: মাথাভাঙ্গা, কালীগঙ্গা, কুমার নদ ও ডাকুয়া নদী।
এখানকার বার্ষিক গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৭.৮°সে এবং সর্বনিম্ন ১১.২°সে। প্রতি বছর গড়ে ১,৪৬৭ মি.মি. বৃষ্টিপাত এ অঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যকে সজীব রাখে।
কুষ্টিয়া শহর এ জেলার প্রশাসনিক সদর দপ্তর। কুষ্টিয়া পৌরসভা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং দেশের ১৩তম বৃহত্তম শহর হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে জেলাটি ৬টি উপজেলায় বিভক্ত: কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, ভেড়ামারা, মিরপুর, খোকসা এবং দৌলতপুর।


কুষ্টিয়াকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’। মানচিত্রের প্রতিটি ভাঁজে এখানে লুকিয়ে আছে ইতিহাস:
লালন শাহের মাজার: ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত আধ্যাত্মিক সাধক লালন ফকিরের সমাধি।
শিলাইদহ কুঠিবাড়ি: যেখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের স্বর্ণসময় কাটিয়েছেন এবং ‘গীতাঞ্জলি’র বহু কবিতা রচনা করেছেন।
মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা: কালুকমলাপুরে অবস্থিত প্রখ্যাত সাহিত্যিকের স্মৃতিবিজড়িত স্থান।
টেগর লজ: কুষ্টিয়া শহরের ভেতর অবস্থিত কবিগুরুর ব্যবসায়িক স্মৃতিধন্য ভবন।

টেগর লজ – কুষ্টিয়া জেলা
শিক্ষা: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এবং ইসলাম বিষয়ক একমাত্র সরকারি বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এই জেলাতেই অবস্থিত।
শিল্প: কুষ্টিয়া শিল্পসমৃদ্ধ একটি জেলা। বিশেষ করে ভেড়ামারায় রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প। কুমারখালী ও ভেড়ামারার বিসিক শিল্পনগরী জেলার অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করেছে।
কুষ্টিয়ার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময়। এক সময় এটি অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে এটি যশোরের অধীনে থাকলেও পরবর্তীতে পাবনা জেলার মহকুমা হিসেবে রাজশাহী বিভাগের অংশ ছিল। ১৮৬৯ সালে এখানে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘হ্যামিলটন’স গেজেট’-এ প্রথম এই আধুনিক কুষ্টিয়া শহরের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কুষ্টিয়ার মানুষের মুখের ভাষাকে বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রমিত বা শুদ্ধ রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্বে এই জেলার ভূমিকা ছিল অনন্য। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক প্রতিরোধের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই কুষ্টিয়া।
