কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে নার্সদের দুর্ব্যবহার
যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ৪০০ বছর আগে গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের শপথ লিখে গিয়েছিলেন। সেটার আধুনিক সংস্করণ আজও চালু আছে। সেখানে বলা আছে : হৃদ্যতা, সহমর্মিতা দিয়ে রোগীদের কথা শুনে তাদের সমস্যা উপলব্ধি করা শল্য চিকিৎসকের ছুরি বা রসায়নবিদের ওষুধের চেয়ে বেশি কার্যকর। চিকিৎসা শিক্ষায় সেই শপথ পাঠ করানোর রেওয়াজ বাংলাদেশেও রয়েছে। তবে পেশায় ঢুকে তা মনে রাখেন- এমন ডাক্তারের দেখা এ দেশে খুব কম রোগীই পায়।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে নার্সদের দুর্ব্যবহার
ডাক্তারের মমত্ববোধে মুগ্ধ হওয়ার বদলে দুর্ব্যবহারে ভীত হওয়ার অভিজ্ঞতাই রোগীদের বেশি। এ দেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ডাক্তার ও নার্সদের দুর্ব্যবহারের মুখে রোগীদের অসহায় হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। শুধু এই কারণেই রোগীদের চিকিৎসা নিতে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার নজিরও দিন দিন বাড়ছে। এমনই অবস্থা কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের। দিন যত যাচ্ছে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লা ভারি হচ্ছে।
গত সোমবার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যাথা জনিত সমস্যা নিয়ে ৩ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন আয়েশা ফেরদৌসী নামে এক শিক্ষিকা। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে কিছুটা স্বাভাবিক হন আয়েশা। এরপর রাতে আবার তার বুকে যন্ত্রণা এবং শ্বাসকষ্ট বাড়লে ৭২ নাম্বার রুমে এ ডাক্তার কে কয়েকবার ডাকলে উনারা আসেন না। রাউন্ড ডাক্তারও আসেন না। এরপর রাত সাড়ে ১২ টার দিকে ওয়ার্ডে উপস্থিত থাকা নার্স এবং স্টাফরা ভুক্তভোগি শিক্ষিকা আয়েশার সাথে বাজে ভাষায় কথাবার্তা বলেন।
এঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিও তে দেখা যায়, বাচ্চা কোলে করে কয়েকজন নার্স এবং একজন ইর্টান ছাত্র বসে এবং ভুক্তভোগী ঐই শিক্ষিকার ইর্টান ছাত্র আশিক মিয়া অকথ্য ভাষায় কথাবার্তা বলেন।
অভিযুক্ত ইর্টান ছাত্র আশিক মিয়া আইডিয়াল নার্সিং ইনস্টিটিউটের ছাত্র এবং শৈলকূপা উপজেলার কাচেরকোল হামদামপুর গ্রামের মো: জাহিদুল শেখের ছেলে। এবিষয়ে ভুক্তভোগী আয়েশা ফেরদৌসীর সাথে কথা বললে তিনি জানান, সোমবার সন্ধ্যায় আমি প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট, বুকে যন্ত্রণা নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হই। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে কিছুটা স্বাভাবিক হই। এরপর রাতে আবার আমার বুকে যন্ত্রণা শুরু করে শ্বাসকষ্ট বাড়ে কিন্তু ৭২ নাম্বার রুমে এ ডাক্তার কে কয়েকবার ডাকলে উনারা আসেন না। রাউন্ড ডাক্তারও আসেন না।
এমতবস্থায় রাত ১২.৩০ আমি আর নিজেকে কন্ট্রোল না করতে পেরে নিজেই ৭২ এর ডাক্তারের কাছে যেতে চাই। তখন সেখানে উপস্থিত ইন্টার্নিরা আমার সাথে বাজে আচরণ শুরু করেন। এবং কথা কাটাকাটির মাঝে আমি শিক্ষক এই পরিচয় দিলে ইন্টার্ন আশিক আমায় বেয়াদব শিক্ষক বলেন। তখন আমি আমার ক্যামেরা ওপেন করি এবং উনি আমাকে বলে ধরেন ক্যামেরা যা করার করেন। যেখানে ভিডিও দেওয়ার দেন। যে যে চ্যানেলে দিতে মন চায় দেন । আমার কোন যায় আসে না। আমি ভয় পাইনা কাউকে। আপনার মতো কতো শিক্ষক দেখলাম। ব্লা,ব্লা,ব্লা, শেষ পর্যায়ে আমি হাত জোর করে ক্ষমা চেয়ে বললাম ভাই ক্ষমা দে আমায়। তুই বড় নেতা। বড় পন্ডিত আমি অতিক্ষুদ্র, অতি নগন্য। এখন আমায় বাঁচতে দে। চিকিৎসা নিয়ে। ততক্ষণে ডাক্তার এসে থামানোর বা বোঝার চেষ্টা করছে ঘটনা।
এখন আমার প্রশ্ন জাতি বা উর্ধতন কর্মকর্তার নিকট, ১. আমি একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যেয়ে যদি আমার এই অবস্থা হয় তাহলে সাধারণ জনগণের কি অবস্থা হতে পারে বা হয়ে থাকে? ২. আমি একজন সম্মানিত শিক্ষক আমার কি এই সম্মান প্রাপ্য ছিলো একজন ইন্টার্নির নিকট থেকে। ৩. হাসপাতালে ডিউটিরত অবস্থায় কি শিশু সন্তান নিয়ে আসার অনুমতি আছে?
ইমরান ইসলাম বাপ্পি নামে আরেক ভুক্তভোগী জানান, আমি আমার বাবাকে নিয়ে দুই নাম্বার ওয়ার্ডের চার দিন ভর্তি ছিলাম। সেখানে দেখেছি প্রতিটা রোগীর সঙ্গে নার্সদের অসহনীয় ব্যবহার কি চরম পর্যায়ের । তারা সেখানে সেবার উদ্দেশ্যে নয় তারা সেখানে চাকরি করে তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে সেবিকা হিসেবে নয়। নার্স আমাকে নিজে বলেছিল। কারণ তারা আমার কাছে টাকা দাবি করেছিল শুধুমাত্র একটু জায়গা পাওয়ার জন্য, কোন সিট ছিল না শুধুমাত্র ওয়ার্ডের মধ্যে ফ্লোরে একটু জায়গা পেতেও টাকা দিতে হয়। ওয়ার্ডের যদি কোন পেশেন্ট মরে যায় তাকেও তারা ধরে না। রোগের স্বজনরা যে কত অসহায় হয়ে পড়ে তাদের সামনে এবং তাদের দুর্ব্যবহারের কি চরম মাত্রায় পৌঁছায় সেটা শুধুমাত্র ভুক্তভোগী রোগী ও তার স্বজনরাই জানে।
মিথুন নামে একজন ভুক্তভোগী বলেন, আমার মেয়ের নিউমোনিয়া হয়ছিলো তখন ইচ্ছার বাইরে বাধ্য হয়ে সদরে ভর্তি করি। ১ম দিনের ট্রিটমেন্ট দিয়ে রাতে বাসায় নিয়ে আসি কেননা রাতে থাকার মত পরিবেশ ছিলো না পরদিন ভোরে আবার হসপিটালে যায়। রাউন্ডে ডাক্তার আসে ২/১ মিনিট দেখে বলে ট্রিটমেন্ট চালিয়ে যেতে দেন আমিও কন্টিনিউ করি। ৩য় দিন নার্স এসে ইঞ্জেকশন দেয়ার কথা বলে তারা ওয়ার্ডের ভিতরে চলে যায় আমি জিজ্ঞেস করি আমি বাবুকে নিয়ে কি আসবো? সেখান থেকে একজন বলে নাহ থাকেন ওখানে এসে দিয়ে যাবে, আমিও অপেক্ষা করি পরে দেখি তারা চলে যাচ্ছে আমি উঠে বললাম আমার মেয়েকে তো ইঞ্জেকশন দিলেন না! এ কথা বলার পরে তাদের রিপ্লাই টা ছিলো এমন (যখন তারা আসছে তখন কেনো দিলাম নাহ মানে ওই রুমে গিয়ে দিয়ে আসার কথা বলছে) তারা নাকি বারান্দা এর রুগিদের দেখাশুনা করে নাহ। তখন আমি বললাম আচ্ছা তাইলে আমি হয়তো খেয়াল করি নাই এখন দিয়ে দেন তারা বলে এখন আর ইঞ্জেকশন দিতে পারবে না আবার পরে যখন আসবে তখন দিবে। এ কথা শুনে আমি একটু জোরে কথা বলি যে কেনো দিবেন নাহ তারা বলে তারা আর এই রুগিকে (আমার মেয়ে) ট্রিটমেন্ট করবে নাহ। পরে নিরুপায় হয়ে বাসায় চলে আসি কেননা তাদের সাথে আমি হয়তো বার্কেটিং করতে পারতাম কিন্তু দিনশেষে তারা যদি আমার মেয়ের সাথে ঝামেলা করে এই জন্য আমি ওখান থেকে চলে এসে বাসায় ট্রিটমেন্ট করি এবং আলহামদুলিল্লাহ আমার মেয়ে এখনো সুস্থ আছে (মাঝে তাদের সাথে আরো কথা কাটাকাটি হয়ছে যাহ এতকিছু লিখার /বলতে পারছি নাহ)।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ওই ইন্টার্নি ছাত্র আশিকের সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি বলেন, চিকিৎসা নিতে আসা ঐ রোগীকে বেয়াদব বলা হয়নি। বলা হয়েছে আরেকজনাকে। তিনি আরো বলেন দূরদূরান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসলে তাদের সাথে একটু খারাপ ব্যবহার করা লাগে, না হলে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না।
এবিষয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: মো: রফিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, রোগীর সাথে দুর্ব্যবহারের বিষয়টি আমার জানা ছিলনা, আপনার কাছ থেকে জানলাম। বিষয়টি দেখে আমি ব্যবস্থা নিব।
