কুষ্টিয়ার ছয় উপজেলায় স্বাস্থ্য সেবার বেহাল দশা - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার ছয় উপজেলায় স্বাস্থ্য সেবার বেহাল দশা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: নভেম্বর ১৬, ২০২৫

দ্রুত সময়ে স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগের দাবী

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ স্বাস্থ্য সহকারী সংকটে বেহাল দশায় পড়েছে কুষ্টিয়া জেলার ৬টি উপজেলার ৬৬টি ইউনিয়নের নাগরিকরা। কুষ্টিয়া জেলার ছয়টি উপজেলায় স্বাস্থ্য সহকারীর শূণ্য পদের সংখ্যা রয়েছে ৯৭। যার ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ের নাগরিকদের স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য সহকারী পদ শূন্য থাকায় বর্তমান কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারীরা অতিরিক্ত কাজ করেও স্বাস্থ্য সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে বলে জানা গেছে। আর এ নিয়ে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারীদের মাঝে নানান ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় দ্রুত সময়ের মধ্যে শুণ্য পদে নিয়োগদানের দাবী জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় কর্মবিরতিতে যাওয়ার মত কঠিন সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন একাধিক স্বাস্থ্য সহকারী। সূত্র মতে, ২০১০ সালে পর থেকে কুষ্টিয়া জেলায় নতুন কোন স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ না হওয়ার ফলে প্রয়োজনের অর্ধেক লোকবল নিয়ে চলছে নাগরিক সেবার এই খাত।

সরকারী বিধি মোতাবেক প্রতিজন স্বাস্থ্য সহকারীর ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি ওয়ার্ডে (সাবেক ওয়ার্ডে) স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার কথা। যদি কোন ওয়ার্ডের জনসংখ্যা ৬ হাজারের বেশী হয় তাহলে ঐ ওয়ার্ডে আরও একজন স্বাস্থ্য সহকারী নতুন করে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে বলে জানা যায়।

কুষ্টিয়া জেলায় কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারীদের তথ্য মতে কুষ্টিয়া জেলায় ৬টি উপজেলায় মোট স্বাস্থ্য সহকারী পদে প্রস্তাবিত পদের সংখ্যা ২৬৬ জন হলেও তার বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী রয়েছে ১৪২ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৬২ শতাংশ কম জনবল নিয়েই চলছে কুষ্টিয়ার ৬টি উপজেলায় ৬৬টি ইউনিয়নের নাগরিকদের স্বাস্থ্য সেবা। দৌলতপুর উপজেলায় প্রস্তাবিত ৬৪ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছে ২৯ জন, ভেড়ামারা উপজেলায় প্রস্তাবিত ২৪ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছে ৯ জন, মিরপুর উপজেলায় প্রস্তাবিত ৪৮ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছে ২৯ জন, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় প্রস্তাবিত ৫৫ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছে ৩৩ জন, কুমারখালী উপজেলায় প্রস্তাবিত ৪৮ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছে ৩০ জন, খোকসা উপজেলায় প্রস্তাবিত ২৭ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছে ১২ জন।

জানা যায়, এ বছরের ২৪ অক্টোবর (শুক্রবার) কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে সাতটি পদের ১১৫টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। মোট ১৬ হাজার ৭৮৯ জন প্রার্থী আবেদন করলেও পরীক্ষায় অংশ নেন অর্ধেকের কিছু বেশি। কিন্তু ঐ নিয়োগ পরীক্ষা বিতর্কিত হওয়ার কারণে ২৫ অক্টোবর নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন নিয়োগ কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক অনিবার্য কারণবশত নিয়োগ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করার কথা জানান। যার ফলে কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে সাতটি পদের ১১৫টি শূন্য পদে নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। যার ফলে থমকে যায় ৯৭ স্বাস্থ্য সহকারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া।

সরকারী তথ্য মতে, খোকসা উপজেলার খোকসা, জানিপুর ও শোমসপুর ইউনিয়নে স্বাস্থ্য সহকারীর শুণ্য পদের সংখ্যা ৭টি। কুমারখালী উপজেলার কয়া, জগন্নাথপুর, সদকী, নন্দলালপুর, চাপড়া, বাগুলাট, যদুবয়রা, চাঁদপুর. পান্টি ও চরসাদীপুর ইউনিয়নে স্বাস্থ্য সহকারীর শুণ্য পদের সংখ্যা ১৬টি। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর, বারখাদা, মজমপুর, বটতৈল, আলামপুর, জিয়ারখী, আইলচারা, ঝাউদিয়া, উজানগ্রাম ও মনোহরদিয়া ইউনিয়নে স্বাস্থ্য সহকারীর শুণ্য পদের সংখ্যা ১৯টি। মিরপুর উপজেলার চিথলিয়া, বহলবাড়ীয়া, তালবাড়ীয়া, বারুইপাড়া, ফুলবাড়ীয়া, আমলা, সদরপুর, ছাতিয়ান, পোড়াদহ, কুর্শা, মালিহাদ এবং আমবাড়ীয়া ইউনিয়নে স্বাস্থ্য সহকারীর শুণ্য পদের সংখ্যা ২৮টি। ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর, মোকারিমপুর, বাহিরচর, চাঁদগ্রাম, ধরমপুর এবং জুনিয়াদহ ইউনিয়নে স্বাস্থ্য সহকারীর শুণ্য পদের সংখ্যা ১০টি। দৌলতপুর উপজেলার মথুপরাপুর, মরিচা, রামকৃষ্ণপুর, চিলমারী, হোগলবাড়ীয়া, পিয়ারপুর, রেফাইতপুর, আদাবাড়ীয়া, বোয়ালিয়া, খলিষাকুন্ডি ও আড়িয়া ইউনিয়নে স্বাস্থ্য সহকারীর শুণ্য পদের সংখ্যা ১৭টি।

বাংলাদেশ হেল্থ এ্যাসিসটেন্ট আসোসিয়েশনের কুষ্টিয়া জেলার সভাপতি ও দৌলতপুরে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী আব্দুল আহাদ বলেন, স্বাস্থ্য সহকারী পদে নিয়োগ না দেওয়া ফলে আমাদের অতিরিক্ত কাজ করতে হচ্ছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে সেই অতিরিক্ত শ্রমের মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। এই বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে একাধিকবার কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন মহোদয়কে জানিয়েছি। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমাদের দাবী অতি সম্প্রতি যে নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে সেই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হোক অথবা দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন করে নতুন ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। আমরা যে কোন মূল্যে সমস্যার সমাধান চাই।

বাংলাদেশ হেল্থ এ্যাসিসটেন্ট আসোসিয়েশনের কুষ্টিয়া জেলার সাধারণ সম্পাদক ও কুমারখালীতে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী মো. আজাদুর রহমান আজাদ বলেন, দীর্ঘ দিন নতুন স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ না হওয়ার ফলে আমাদের প্রায় দ্বিগুন কাজ করতে হচ্ছে। যার ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগের কোন বিকল্প নেই। আমরা চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে চলমান সমস্যার সমাধন করে স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ নিশ্চিত করা হোক। বাংলাদেশ হেল্থ এ্যাসিসটেন্ট আসোসিয়েশনের কুষ্টিয়া জেলার সংগঠনিক সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদরে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী শামীম আহমেদ জানান, সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে আমাদের অনুরোধ যে কোন ভাবে সমস্যার সমাধান করে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক।

দীর্ঘ দিন ধরে আমরা অতিরিক্ত কাজ করে আসছি। এই ভাবে চলতে থাকলে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে সরকারের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন বাধা গ্রস্থ হবে। বাংলাদেশ হেল্থ এ্যাসিসটেন্ট আসোসিয়েশনের মিরপুর উপজেলার সভাপতি ও মিরপুরে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, সরকারী বিধি মোতাবেক আমাদের যেখানে একটি ওয়ার্ডে কাজ করার কথা, সেখানে লোকবল সংকটের কারণে আমাদের দুই থেকে তিনটি ওয়ার্ডে কাজ করা লাগে। যার ফলে আমাদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০১০ সালের পরে কুষ্টিয়াতে নতুন কোন স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আমরা চাই সকল সমস্যার সমাধান করে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক।

সার্বিক বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, জনবল সংকটের কারণে কুষ্টিয়ার স্বাস্থ্য খাতের সব সেক্টরেই স্থবিরতা বিরাজ করছে। সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠতেই সাতটি পদে ৯৭ জন স্বাস্থ্য সহকারী সহ ১১৫ জন নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া করা হয়েছিলো। এখন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ যেভাবে চাইবে আমরা সেইভাবেই কাজ করবো। জেলা প্রশাসন কর্তৃক নিয়োগ বোর্ডের প্রতিনিধি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তদন্ত চলছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সামাধান হবে।