কুষ্টিয়ায় সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ইয়াবা উদ্ধার
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ কুষ্টিয়া ॥ কুষ্টিয়া শহরের ব্যস্ততম পাঁচ রাস্তার মোড় এলাকায় অবস্থিত সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস অফিস থেকে ১,৮০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার সকালে কুষ্টিয়া মডেল থানার একটি বিশেষ টিম এই অভিযান চালায়। এ সময় মাদক পাচারে জড়িত সন্দেহে দুই ব্যক্তি পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের আটকের চেষ্টা চলছে।

কুষ্টিয়ায় সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ইয়াবা উদ্ধার
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপার খাইরুল আলম-এর দিকনির্দেশনায় কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহুরুল ইসলাম-এর নেতৃত্বে একটি দল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে উপস্থিত ছিলেন এসআই সাজু মোহন শাহ, এএসআই শাহীন আলম, এএসআই আসাদ এবং সঙ্গীয় ফোর্সের সদস্যরা।
তারা জানতে পারেন, কক্সবাজারের চকরিয়া এলাকা থেকে মাদক ব্যবসায়ীরা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ইয়াবার চালান পাঠিয়েছে কুষ্টিয়ায়। খবর পেয়ে পুলিশ সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে পৌঁছে মালামালের বস্তা তল্লাশি শুরু করে।
তল্লাশির সময় একটি পার্সেল সন্দেহজনক মনে হলে সেটি খোলা হয়। দেখা যায়, পার্সেলটিতে একটি মোবাইল ফোন মেরামতের টাটাল (টুল) মেশিন রয়েছে, যার ভেতরে কৌশলে মোড়ানো অবস্থায় ১০টি ছোট প্যাকেট রাখা হয়েছে। প্যাকেটগুলো খুলে দেখা যায়, ভিতরে রয়েছে নীল রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট—গণনা করে দেখা যায় মোট ১,৮০০ পিস।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি জহুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন—
“প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে পার্সেলটি বুকিং করা হয়েছিল। মাদক ব্যবসায়ীরা চতুর কৌশলে ইয়াবাগুলো মেশিনের ভেতরে লুকিয়ে পাঠিয়েছিল, যাতে কেউ সন্দেহ না করে। আমরা কুরিয়ার বুকিং তথ্য সংগ্রহ করেছি, কে পাঠিয়েছে ও কে রিসিভ করবে তা যাচাই চলছে।”
তিনি আরও জানান,
“মাদক পাচারের এ ধরণের নতুন পদ্ধতি এখনই বন্ধ করতে হবে। এজন্য কুরিয়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে সন্দেহজনক পণ্য যাচাইয়ের।”
ওসি জহুরুল ইসলাম বলেন, উদ্ধার করা ইয়াবাগুলোর বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
“অভিযান চলাকালীন দুই ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছে। তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে এবং শিগগিরই গ্রেপ্তার করা হবে।”
ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ পুলিশ এসে কুরিয়ার অফিস ঘিরে ফেলে। এরপর তারা প্যাকেট খুলে ইয়াবা উদ্ধার করে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন—
“আমরা অনেক দিন ধরেই সন্দেহ করছিলাম, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক আনা–নেওয়া হয়। আজ পুলিশ হাতে-নাতে ধরেছে।”
অন্য একজন বলেন,
“সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস খুব নামকরা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যদি কেউ তাদের নাম ব্যবহার করে অবৈধ কাজ করে, তাহলে সেটা বন্ধ করা দরকার।”
ঘটনার পর স্থানীয় সাংবাদিকরা সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কুষ্টিয়া শাখা ব্যবস্থাপক-এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান—
“আমরা প্রতিদিন শত শত পার্সেল রিসিভ করি। মালিক বা প্রেরকের তথ্য যাচাই করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তবে আমরা পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কেউ অবৈধ কার্যকলাপ করলে তার দায় আমাদের নয়।”
তবে পুলিশ বলেছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর ওপরও নজরদারি বাড়ানো হবে।
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মাদকবিরোধী অভিযানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
গত সপ্তাহে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিজিবি’র অভিযানে তিনজনকে আটক করা হয়, যাদের কাছ থেকে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়।
একই সময় কুমারখালী উপজেলায় বিদ্যুতায়িত হয়ে এক কলেজ ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান—
“কুষ্টিয়া–ঝিনাইদহ–চুয়াডাঙ্গা অঞ্চল এখন মাদক পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল ও বিদেশি মদ পাচারকারীরা বিভিন্ন কৌশলে কুরিয়ার সার্ভিস বা ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করছে। এ কারণে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।”

কুষ্টিয়ার মতো সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাবান্ধব শহরে ইয়াবার মতো ভয়ঙ্কর মাদক পৌঁছে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মাদকচক্র যতই কৌশল অবলম্বন করুক, পুলিশ ও গোয়েন্দা ইউনিট সজাগ রয়েছে। অপরাধীরা যতই চতুর হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
