কুমারখালীতে পেঁয়াজ ৪২ কেজিতে মণ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীতে পেঁয়াজ ৪২ কেজিতে মণ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ১৬, ২০২৬

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ কৃষিপণ্য ক্রয় – বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত মানদন্ড অনুযায়ী ৪০ কেজিতে হয় এক মণ। কিন্তু কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার হাট গুলোতে বাস্তব চিত্র তার ভিন্ন। এখানে ৪২ কেজিতে মণ হিসেবে বেঁচাকেনা চলছে পেঁয়াজ। আবার প্রতি মণ পেঁয়াজ ক্রয় – বিক্রয়ে সরকার নির্ধারিত খাজনা দুই টাকা ৪০ পয়সা। তবে কৃষকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২০ টাকা করে। এতে হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

প্রতিমণ পেঁয়াজে তাঁদের খোয়া যাচ্ছে দুইকেজি পেঁয়াজ ও খাজনা বাবদ ১৭ টাকারও বেশি । হাট যেন পেঁয়াজ চাষির মরার উপর খাড়ার ঘা। কৃষকদের ভাষ্য, হাটে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। হাট মালিক কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে মত নিয়ম চালু করেছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন কৃষকরা। তাঁরা হাটে সঠিক পরিমাপ ও সরকার নির্ধারিত খাজনা বাস্তবায়নের দাবি জানান। জানা গেছে, প্রতি রোববার কুমারখালী শহর – পান্টি সড়কের চৌরঙ্গী মহাবিদ্যালয় মাঠে বসে সাপ্তাহিক পেঁয়াজের হাট।

গতকাল সকালে সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের দুই ধার ও কলেজমাঠ জুড়ে বসেছে বিশাল পেঁয়াজের হাট। বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এসেছেন। তাঁরা পেঁয়াজ ক্রয় – বিক্রয়ে ব্যস্ত। এ দিন হাটে প্রায় পাঁচ হাজার মণ পেঁয়াজের আমদানি হয়েছিল। মানভেদে প্রতিমণ পেঁয়াজ ৪৫০ থেকে এক হাজার ৩৫০ টাকা দরে বেঁচাকেনা চলছে। এ সময় হাটে আসা উপজেলার পান্টি এলাকার মৃত ইউসুফ আলীর কৃষক ছেলে নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, পেঁয়াজের দাম নাই। মণে ২০ টাকা করে খাজনা। মণে ২ কেজি করে ঢলন (এক মণ সমান ৪২ কেজি)। এম্বা হলি ক্যাম্বা বাঁচবি কৃষক, বলেন।

খোকসার ওসমানপুর ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের ছানোয়ার উদ্দিনের ছেলে আখের আলী বলেন, ১০ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছি ১১শ টাকা মণ দরে। এখানে ৪২ কেজিতে মণ হিসেবে বেঁচাকেনা চলছে। মণ প্রতি খাজনা লেগেছে ২০ টাকা। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এক মণ সমান ৪০ কেজি হলেও হাটে ৪২ কেজিতে মণ। তবে সরকার নির্ধারিত খাজনা কত তা জানেনা কেউ। এদিন হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে এসেছিলেন যদুবয়রা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক। নাম প্রকাশ না করা শর্তে তিনি বলেন, ২ টাকা ৪০ পয়সার বদলে খাজনা নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। আবার ৪২ কেজি হিসেবে মণ ধরা হচ্ছে। এতে কৃষককের লোকসান হচ্ছে।

নিয়ম অনুযায়ী হাট পরিচালিত হলে কৃষক বাঁচত। তাঁর ভাষ্য, হাটে প্রশাসনের নজরদারি নেই। কৃষকরা হাট মালিকের নিয়ম মানতে বাধ্য। স্থানীয় ব্যবসায়ী জামশেদ শেখ বলেন, এখন কাঁচা পেঁয়াজ হওয়ায় ৪২ কেজিতে মণ বেঁচাকেনা চলছে। কয়েক মাস পরে ৪১ কেজিতে মণ ধরা হবে। বস্তাপ্রতি ( ৭০-৮০ কেজি) খাজনা দেওয়া লাগে ২৩ টাকা। তাঁর ভাষ্য, সরকারি নিয়ম জানা নেই। এখানে বাজার মালিকদের করা আইনে চলতে হয়। প্রায় ১৮ বছর ধরে চৌরঙ্গী হাটে পেঁয়াজের ব্যবসা করে আসছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার করিমপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেন।

তিনি রোববার হাটে মানভেদে ৩৫০ টাকা থেকে ৮৫০ টাকা মণ দরে প্রায় ৪০০ মণ পেঁয়াজ কিনেছেন। তিনি বলেন,এখন কাঁচা পেঁয়াজ। রোদে শুকিয়ে যায়। মোকামে নিতে নিতে ঘাটতি হয়। সেজন্য ৪২ কেজিতে মণ কেনা হচ্ছে। মণ প্রতি ১৩ – ১৫ টাকা খাজনা দেওয়া হয় ইজারাদারকে। জানা গেছে, শুধু চৌরঙ্গী হাট নয়। উপজেলার সবগুলো হাটেই পেঁয়াজের

মৌসুমে ৪২ কেজিতে এবং বৈশাখ মাসের শেষের দিকে ৪১ কেজিতে মণ ধরা হয়। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার বাঁশগ্রাম শ্বশ্মানঘাট, বুধবার আলাউদ্দিন নগর, বৃহস্পতিবার বাঁশগ্রাম কলেজ মাঠ এবং সোম ও শুক্রবার পান্টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বসে সপ্তাহিক পেঁয়াজের হাট। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আধিপত্য বিস্তার ও গ্রুপিংয়ের কারণে বছর গেলেই বেড়ে যায় হাটের ইজারা। ইজারার বাড়তি খরচ তুলতে কাটা হয় কৃষকদের পকেট।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ হাট গুলোতে আসেন ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য। কৃষকদের অভিযোগ স্বীকার করে চৌরঙ্গী পেঁয়াজ হাটের ইজারাদার মতিউর রহমান বলেন, সকল হাট মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কাঁচা পেঁয়াজ ৪২ কেজিতে এবং শুকনো পেঁয়াজ ৪১ কেজি হিসেবে মণ ধরা হয়। আর বছর বছর হাটের ইজারা বেড়ে যাওয়ার ওপর খাজনা নির্ধারন করা হয়। তাঁর ভাষ্য, ১০ বছর আগে হাটের ইজারা ছিল সাত লাখ টাকা। তখন খাজনা ছিল ১০ টাকা মণ।

এবার ইজারা প্রায় ৩১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। সেজন্য এবার বস্তাপ্রতি ২৩ টাকা হারে খাজনা নেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পান্টি হাট পরিচালনার কমিটির এক সদস্য বলেন, গতবছর সোমবার ও শুক্রবার হাটের ইজারা ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা। কিন্তু দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে এবার হাটের ডাক হয়েছে প্রায় ৩৪ লাখ টাকা। তবুও খাজনা গতবছরের ন্যায় ১০ টাকা মণ নেওয়া হচ্ছে। হাটে ৪০ কেজির বদলে ৪১ থেকে ৪৫ কেজি হিসেবে মণ ধরা হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত খাজনা নেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কাওছার আলী। তিনি বলেন, হাটে কৃষকরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে জানানো হবে। তাঁর ভাষ্য, চলতি মৌসুমে উপজেলায় চার হাজার ৯২৮ হেক্টর জমিতে প্রায় এক লাখ ৩ হাজার মেট্রিকটন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, ৪২ কেজিতে মণ বা অতিরিক্ত খাজনা নেওয়ার বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।