কুমারখালীতে তুচ্ছ ঘটনায় ভাইয়ের হাতে ভাই খুন - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীতে তুচ্ছ ঘটনায় ভাইয়ের হাতে ভাই খুন

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ২২, ২০২৬

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে তুচ্ছ ঘটনায় ছোট ভাইয়ের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে বড় ভাই নিহত হয়েছেন। সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার কয়া ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া বাড়াদী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত রাশেদ শেখ (৩০) ওই এলাকার মৃত রবিউল শেখের ছেলে। তিনি পেশায় ফেরিওয়ালা।

পরিবারে তাঁর স্ত্রী লাকী খাতুন (২৫), ছেলে রাফি (৯), মেয়ে রায়শা ( ৩) ও মা সবুরা খাতুন (৫০) রয়েছেন। পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য, ছোট ভাই জহুরুল শেখ তাঁর বড় ভাই রাশেদকে ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে গেছেন। তবে কেন এমন নির্মম হত্যার ঘটনা, তার সঠিক কারণ জানা যায়নি। কেউ বলছেন, টাকা চেয়ে না পেয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আবার কেউ বলছেন, জহুরুল মাদকাসক্ত ও মানসিক রোগী। সেজন্য মানসিক বা পারিবারিক কলহের জেরে বড় ভাইকে হত্যা করে পালিয়েছেন।

পুলিশ, স্বজন ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, রাশেদ শেখ জীবিকার্জনের জন্য বরিশালে ফেরি করে মশারির ব্যবসা করেন। প্রায় ২০ দিনপর সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি বাড়িতে আসেন। এরপর রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁর স্ত্রী লাকী খাতুন প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে ঘরের বাইরে ওয়াশরুমে যান। তখন রাশেদ ঘরের বারান্দায় বসে স্মার্টফোন চালাচ্ছেন। এ সময় হঠাৎ তাঁর ছোট ভাই জহুরুল তাকে ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ঘাড়, পেটসহ শরীরের একাধিক স্থানে আঘাত করে এবং নিজঘরে তালা লাগিয়ে পালিয়ে যান।

এরপর ওয়াশরুম থেকে এসে রাশেদের স্ত্রী আহত স্বামীকে দেখে চিৎকার চেঁচাচেচি শুরু করেন। পরে প্রতিবেশী ও স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে রাত পৌণে ২টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। তখন সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত জহুরুল কাজকাম করেন না। কয়েকবছর ধরে ভবঘুরে বেড়ান এবং মাদকাসক্ত। সেজন্য তাঁর স্ত্রী আলো খাতুন তাঁর দুই সন্তান নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন।

জহুরুল তাঁর ভাই, মাসহ প্রতিবেশীদের কাছে বিভিন্ন সময়ে শুধু টাকা ধার চাইতেন। গত রমজানের ঈদেও বড় ভাই ও মায়ের কাছে পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাকে টাকা দেননি। গতকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ১২টার দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কয়া মাহতাবিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় – বানিয়াপাড়া বাড়াদী সড়ক ঘেঁষে নিহত রাশেদ শেখের টিনশেডের আধাপাকা ঘর। ঘরটির সামনের আমগাছের গোড়াতে জমে আছে রক্তের স্তুপ। সেখানে কাজ করছে পুলিশ।

বাড়ির বাইরের সড়কের ধারে টাঙানো সামিয়ানার নিচে আহাজারি করছেন স্বজনরা। খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন উৎসুক জনতা। এ সময় নিহত রাশেদের স্ত্রী লাকী খাতুন বলেন, ও ( স্বামী) বারান্দায় বসে মোবাইলে ভিডিও দেখছিল। আর আমি ওয়াশরুমে গিছিলাম। ওয়াশরুমে বসার

সাথেসাথে একটা শব্দ (চিৎকার) শুনি। আর বাইরে এসে দেখি জহরুল ওকে (স্বামী) কোপাচ্ছে। আমি কাছে আসতেই ও (জহরুল) দৌড়ে চলে যায়। তখন আমি সগলের ডাকেডুকে হাসপাতালে নিলে ডাক্তার বলেন মরে গেছে। তিনি আরো বলেন, জহুরুলের সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিলোনা।

ও ( জহুরল) কাজ করেনা, শুধু নেশা করত। গত ঈদে পাঁচ হাজার টাকা চাইছিল। কিন্তু দিছিলাম না। তখন হত্যার হুমকি দিছিল। সেই রাগ ও এতোদিন পুষে রাখবে ভাবিনি। আমি স্বামী হত্যার সঠিক বিচার চাই। যে আমার দুই শিশুকে এতিম করল আমি তাঁর ফাঁসি চাই। নিহত রাশেদের ছেলে রাফি ( ৯) বলে, আব্বা বারান্দায় মোবাইল টিপছিল।

আর মা বার্থরুমে গিছিল। তখন চাচ্চু এসে ছুরি দিয়ে আব্বাকে কোপাচ্ছিল। আমি ঘরের ভিতর থেকে দরজার ফাঁক করে দেখছিলাম আর চিল্লাচ্ছিলাম। ছোট ছেলে পলাতক। আর বড় ছেলে নিহত হওয়ায় শোকে মাতম মা সবুরা খাতুন। তিনি আহাজারি করছিলেন। স্বজনরা তাকে ঘিরে শান্তনা দিচ্ছেন। এ সময় বিলাপ করতে করতে সবুরা খাতুন বলেন, আমার সব শ্যাষ হয়ে গেল। আমার কেউ রইলো না। আমি কি নিয়ে থাকবনে। তিনি বলেন, আমি বাড়ি ছিলাম না। বড় মেয়ের বাসায় গিছিলাম।

রাতে শুনলাম বড় ছেলে আর নেই। শুনেই চলে আসছি। তাঁর ভাষ্য, ছোট ছেলে অনেকদিন ধরে মানসিক রোগী। আর বড় ছেলেকে কে বা কারা মারেছে রাতের আধারে তা দেখা যায়নি। কি বিচার চাবো? কার বিচার চাবো? এ দিনে ঘটনার পর থেকে নিহত ব্যক্তির ছোট ভাই পলাতক রয়েছেন। খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন তাঁর স্ত্রী আলো খাতুন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার স্বামী কাজকাম করেনা। নেশাভান করত। বারবার টাকা চাইতো। সেজন্য স্বামীকে ছেড়ে চলে গেছি অনেক আগেই।

এখন কি জন্য হত্যা করল তা জানিনা। তবে যে অপরাধী তাঁর বিচার হোক।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক (আরএমও) হোসেন ইমাম মুঠোফোনে বলেন, হাসপাতালের আসার আগেই রাশেদের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর শরীরের একাধিক স্থানে গভীর ক্ষত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ছোট ভাইয়ের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বড় ভাই নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পারিবারিক বা মানসিক কলহের জেরে এঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্তকে ধরা গেলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন।