বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কালিগঙ্গা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, আর্থিক অসংগতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠদান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা চলে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন শিক্ষক প্রায়ই অনুপস্থিত থাকেন, কিন্তু সপ্তাহে মাত্র এক দিন এসে হাজিরা খাতায় পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর করে দেন। এ ছাড়া এই শিক্ষকরা নির্ধারিত সময়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন না এবং ক্লাসের সময় শেষ হওয়ার আগেই শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি অভিভাবকদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার জেলা শিক্ষা অফিসার আবু তৈয়ব মোঃ ইউনুস আলী বলেন, “দীর্ঘদিনের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ০২/০৯/২০২৬ তারিখে বিদ্যালয় পরিদর্শন করে চারজন শিক্ষককে অনুপস্থিত পাই। ছুটির দরখাস্ত চাইলে প্রধান শিক্ষক তা দেখাতে পারেননি।”
জেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাওয়া গবেষণা কর্মকর্তা মোঃ সবুজ হোসেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, কিছু শিক্ষক ক্লাসে দেরিতে প্রবেশ করেন এবং ঘণ্টা পড়ার আগেই ক্লাস থেকে বের হয়ে যান।”
তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট হাজিরা খাতা, ছুটির আবেদন, ক্লাস রুটিন ও অন্যান্য প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দেওয়া হয়, যাতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁরা বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এ বিষয়ে বাঁধবাজার এলাকার এক দোকানি বলেন, “স্কুল তো প্রায় প্রতিদিনই দুপুর ১টার দিকে ছুটি হয়ে যায়।”
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ শামসুজ্জামান মুকুলের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনভিপ্রেত, অশালীন ও যৌন হয়রানিমূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হলেও বিষয়গুলো যথাযথভাবে তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা হয়নি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করলে মোছাঃ শাহীনা খাতুন, মোঃ ইব্রাহিম হোসেন, মোঃ খাইরুল ইসলাম ও মোছাঃ মুসলিমা খাতুন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগের সত্যতা রয়েছে বলে দাবি করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বহিষ্কারের দাবি জানায়। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বেতন, সেশন চার্জ ও অন্যান্য ফি-এর হিসাব-নিকাশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে আদায় করা অর্থের হিসাব ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে গরমিলের অভিযোগ রয়েছে। অর্থ আদায়ের রশিদ, ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য আর্থিক নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ আদায়ের দিনই ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা কখনো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, এ পর্যন্ত উত্তোলিত কোনো অর্থই ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়নি; বরং আদায়কৃত অর্থের পুরোটাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে থাকে এবং তিনি নিজের ইচ্ছেমতো তা ব্যয় করেন। অর্থের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামগ্রীও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, “শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত কোনো অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়নি এবং কোনো শিক্ষক-কর্মচারীকেও দেওয়া হয়নি। কীভাবে কী খরচ হয়েছে, তা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকই জানেন।” এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের আর্থিক নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব, রশিদ বই ও ব্যয়ের ভাউচার পরীক্ষা করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীরা বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থের ব্যবহার এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছাঃ শাহীনা খাতুনের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সপ্তাহে একদিন এলেও পুরো সপ্তাহের স্বাক্ষর করতে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
তবে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর মতে, কারও ব্যক্তিগত বা মানসিক বিষয় নিয়ে মন্তব্য না করে তাঁর প্রশাসনিক কার্যক্রম, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করাই সমীচীন। অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে তাদের পরিবারকে অবহিত করে আসছে, যা কেন্দ্র করে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁরা বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা—বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই; ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন অডিট; শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থের ব্যবহার পরীক্ষা; শিক্ষক-কর্মচারীদের হাজিরা ও উপস্থিতির রেকর্ড যাচাই; নির্ধারিত ক্লাস রুটিন অনুযায়ী পাঠদান হয়েছে কি না তার তদন্ত; শিক্ষার্থীদের অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত; এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান না হওয়া, নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় ছুটি দেওয়া এবং অফিসে বসে সময় কাটানোসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিলে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মিত উপস্থিতি, দ্বৈত চাকরি, ছাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, অর্থের হিসাবে গরমিল ও বিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ওহিদ-উজ-জামান এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে গেলে সংশ্লিষ্টরা পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে প্রভাবিত করে তাঁকে অপসারণের চেষ্টা করেন। এ উদ্দেশ্যে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও হয়রানী মুলক দেওয়ানি মামলা নং-১৫১/২৫ দায়ের করে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়। আদালত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দিলেও তা উপেক্ষা করে পরবর্তীতে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, বিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়, অফিসকক্ষে তালা দেওয়া হয় এবং বিদ্যালয়ের নথিপত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সময়ে ব্যাংক হিসাবের স্বাক্ষর পরিবর্তন ও শিক্ষা বোর্ডের সিম উত্তোলনের ঘটনাও ঘটে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএ-তে চাহিদা প্রেরণের সময় প্রধান শিক্ষক পদটি শূন্য দেখিয়ে চাহিদা প্রদান করা হয়েছে। মামলাটি নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই প্রধান শিক্ষক পদটি শূন্য দেখিয়ে চাহিদা প্রদানের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যাতে কোনো অবস্থাতেই বর্তমান প্রধান শিক্ষক তাঁর পদে পুনর্বহাল হয়ে দায়িত্বে ফিরতে না পারেন।
এছাড়াও, আদালতের রায় ঘোষণার পূর্বেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ব্যানবেইসের জরিপে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তালিকা থেকে বর্তমান প্রধান শিক্ষকের নাম কর্তন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এভাবে প্রধান শিক্ষক পদটি শূন্য দেখানো এবং শিক্ষকদের তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা আদালতের বিচারাধীন বিষয়কে প্রভাবিত করার চেষ্টা কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে বিদ্যালয়ের চলমান অস্থিরতা নিরসন করে স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সাময়িক বহিষ্কৃত পূর্বের প্রধান শিক্ষক মোঃ ওহিদ-উজ-জামানকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পুনরায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। এ বিষয়ে পাহাড়পুর এলাকার বাসিন্দা রাজ্জাক বলেন, “যতদূর জানতে পেরেছি, বহিষ্কৃত প্রধান শিক্ষক একজন আদর্শ, মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষক।
দুষ্কৃতিকারীদের অনৈতিক চাওয়া পূরণ না করায় ষড়যন্ত্র করে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে কিছু শিক্ষক নিজেদের ইচ্ছেমতো বিদ্যালয়ে আসেন, ক্লাস নেন এবং ছুটি দেন। তাঁরাই এখন বিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তি, তাই সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে যা ইচ্ছা তা-ই করছেন।” এ প্রসঙ্গে একজন অভিভাবক বলেন, একজন প্রধান শিক্ষককে দীর্ঘ সময় দায়িত্বের বাইরে রেখে প্রশাসনিক নেতৃত্ব অনিশ্চিত রাখলে তার নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষা কার্যক্রমে পড়তে পারে। চলমান বিরোধ ও অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিদ্যালয়ে দ্রুত স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। অভিভাবকদের ভাষ্য, তাঁরা কোনো পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে নন; বরং বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চান।
অভিভাবক ও এলাকাবাসীর দাবি, অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক; আবার কোনো অভিযোগ অসত্য বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তা-ও স্পষ্টভাবে জানানো হোক। তাঁদের প্রত্যাশা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে কালিগঙ্গা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।









