মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ আজ ২৫ বৈশাখ। বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্রপুরুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী। এ উপলক্ষ্যে কবির স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহের কুঠবাড়িতে জাতীয়ভাবে তিনদিনব্যাপী বার্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ শিরোনামে আজ দুপুর আড়াইটায় প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। তবে এবার বসছেনা ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। এ সব তথ্য নিশ্চিত করে শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির কাস্টোডিয়ান মো. আল আমিন বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মজয়ন্তী উদযাপনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিন দিনব্যাপী রবীন্দ্র সংগীত, কবিতা আবৃত্তি, আলোচনা সভা ও মঞ্চ নাটক চলবে আগামী রোববার মধ্যরাত পর্যন্ত।
জানা গেছে, বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮০৭ সালে এই অঞ্চলে জমিদারি পান। ১৮৯১ সালে পিতার আদেশে জমিদারি দেখাশোনার কাজে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহে আসেন। কবিগুরু ১৯০১ সাল পর্যন্ত শিলাইদহে জমিদারি পরিচালনা করেন। পদ্মা পাড়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি একে একে রচনা করেন সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালীসহ বিখ্যাত সব কাব্য গ্রন্থ।
নিভৃত বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল শিলাইদহে কবির জীবনের বেশ কিছু মূল্যবান সময় কেটেছে। এখানে বসে রচিত গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থই রবীন্দ্রনাথকে এনে দিয়েছে নোবেল পুরস্কার আর বিশ্বকবির মর্যাদা। এ ছাড়াও তিনি এখানে বসেই আমাদের জাতীয় সংগীতসহ অসংখ্য কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেছেন। কুঠিবাড়িতে সংরক্ষিত আছে সেসব দিনের নানা স্মৃতি। অসংখ্য গান, কবিতা, চিঠি, চিত্রকর্ম ও সাহিত্য শিলাইদহকে করেছে রবীন্দ্রসাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কুঠিবাড়ির সম্মুখে ফাঁকা মাঠে প্রস্তুত মঞ্চ। দেওয়াল ও গাছের গুড়াতে সাদা রঙ লাগানো হয়েছে। কুঠিবাড়ির সামনের সড়কে চলছে আলপনা আকাঁর কাজ। কুঠিবাড়ির চত্বরে সাজসাজ রব। ভিতরে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে এসেছেন রবীন্দ্র ভক্তরা। শিলাইদহ খোরশেদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া খাতুন বলেন, কবিগুরুর জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে সাজসজ্জা দেখতে এসেছি।
কুঠিবাড়িতে পা রাখলেই অদ্ভুত অনুভূত হয়। মনে হয় এখানকার আকাশে বাতাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে এখনও। সিরাজগঞ্জ থেকে এসেছেন শিক্ষার্থী ইসরাইল হোসেন। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, আমাদের ওখানেও কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থান রয়েছে। তবও শিলাইদহের কুঠিবাড়িটি দেখার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল। তাই জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এসে দেখছি সাজসাজ রব। এখানকার পরিবেশ খুব সন্দর।
দেখলেই মন ভরে যায়। ২৫ শে বৈশাখ উপলক্ষ্যে ফরিদপুর থেকে শিলাইদহ এলাকায় স্বজনদের বাড়িতে এসেছেন বে-সরকারি চাকুরিজীবি পলাশ মাহমুদ। তিনি বলেন, কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্র সাহিত্য কর্মের উপর থিয়েটার, ডিসপ্লে প্রদর্শনী সহ আরো কিছু সংযোজন করা দরকার। যেন দর্শনার্থীরা আরো বেশি সময় ধরে এখানে থাকতে পারেন।
কালবৈশাখী ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোককাবেলার চিন্তা মাথায় রেখেও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে জন্মজয়ন্তী উদযাপনের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে ‘ঠাকুরের জন্মদিন ঘিরে স্বাধীনতার পর থেকেই দেখে আসছি কুঠিবাড়ির মেলা। মেলার কয়েকদিন আগে থেকেই মেয়ে-জামাই আর আত্মীয়-স্বজনরা শিলাইদহে ভিড় করতেন। বাড়ির আঙিনায় উৎসব লেগে থাকতো। কিন্তু এবার নাকি একেবারেই মেলা হচ্ছে না, দোকানদাররা সব চলে যাচ্ছে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে কথাগুলো বলছিলেন কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের কসবা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রবিউল ইসলাম। তার আক্ষেপেই ফুটে উঠছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির চিরচেনা চিত্র বদলে যাওয়ার বেদনা। জানা গেছে, আগামী ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। প্রতিবছর এই উৎসবকে ঘিরে কুঠিবাড়ির আমবাগানে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা বসলেও, এবার দীর্ঘদিনের সেই প্রথা ভেঙে মেলা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন।
তবে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কুঠিবাড়িতে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকলেও মেলার কেন এই ‘নিষেধাজ্ঞা’, তা নিয়ে রবীন্দ্রভক্ত ও স্থানীয়দের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরেজমিন দেখা গেছে, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের পসরা গুছিয়ে নিচ্ছেন। কারও চোখে জল, কারও মুখে তীব্র আক্ষেপ।
প্রায় ২০ বছর ধরে এই মেলায় আসা মাদারীপুরের আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, টাকা-পয়সা খরচ করে দূর থেকে আসছি। এসে শুনলাম মেলার অনুমতি নেই। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছি। সামনের বছর আর আসব না।’ শরীয়তপুরের খেলনা ব্যবসায়ী মীর বাবুল জানান, গত বুধবার বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে দোকান ভেঙে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তার দাবি, শতাধিক ব্যবসায়ী দোকান বসিয়েছিলেন, যাদের প্রত্যেকের ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক লোকসান হয়েছে। ব্যবসায়ীদের কণ্ঠে একই সুর—কুঠিবাড়ি মেলার যে ঐতিহ্য ছিল, তা এবারই যেন হারিয়ে গেল। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ আব্দুস সাত্তার (৭২) বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে কোনো বছর এই মেলা মিস হয়নি। ঐতিহ্যবাহী কুঠিবাড়ির এই গ্রামীণ মেলা যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখা উচিত ছিল।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন বলেন, কবিগুরুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী আলোচনা সভা ও কালচারাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তবে প্রস্তুতি সভায় সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এবার মেলা হচ্ছে না।
