খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৪৭ পিএম

গড়াই আর পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা কুষ্টিয়া জেলাকে বহু আগে থেকেই পরম মমতায় বাংলাদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ বলে ডাকা হয়। বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইজির একতারার সুর, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহের কুঠিবাড়ি আর সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদ এদেশের শিল্প, সাহিত্য ও মননশীলতার এক অনন্য চারণভূমি। তবে এই অনন্য সাংস্কৃতিক আভিজাত্যের আড়ালে কুষ্টিয়ার একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি এবং নামের বিবর্তনের গল্প রয়েছে, যা এই অঞ্চলের মাটি ও মানুষের মতোই বৈচিত্র্যময়।

কুষ্টিয়া নামের উৎপত্তি কীভাবে হলো, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে বেশ কিছু কৌতূহল উদ্দীপক মতভেদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও ঐতিহাসিক দলিলসমৃদ্ধ তথ্যটি পাওয়া যায় ১৮২০ সালে প্রকাশিত ওয়াল্টার হ্যামিল্টনের বিখ্যাত ‘হ্যামিল্টন্স গেজেটিয়ার’ (Hamilton’s Gazetteer) সূত্র থেকে। এই গেজেটিয়ারে স্থানটির নাম ‘Kustee’ বা ‘কুষ্টি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ঔপনিবেশিক আমলে এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে উন্নতমানের পাটের চাষ হতো। স্থানীয় কৃষকেরা তাদের আঞ্চলিক ভাষায় পাটকে ‘কোষ্টা’ বা ‘কুষ্টি’ বলে ডাকতেন। ইতিহাসবিদদের বড় একটি অংশের মতে, এই সোনালী আঁশ ‘কুষ্টি’ থেকেই কালক্রমে এই জনপদের নাম স্থায়ীভাবে ‘কুষ্টিয়া’ হয়েছে।
নামকরণ নিয়ে আরেকটি দলিলের দিকে তাকালে দেখা যায় মুঘল আমলের ইতিহাস। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে এই অঞ্চলে নদীপথের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি সুসংগঠিত নদী বন্দর স্থাপন করা হয়েছিল, যা ‘কুষ্টি বন্দর’ নামে পরিচিতি পায়। এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে একটি বড় বাজার ও শহরের পত্তন ঘটে, যার নাম হয় কুষ্টিয়া।
অন্যদিকে, ভাষা ও ইতিহাসের গবেষকদের একাংশ এর পেছনে একটি ফারসি শব্দের সংযোগ খুঁজে পান। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুর্তাজা আলীর মতে, ফারসি শব্দ ‘কুশতহ’ বা ‘কুস্তা’ থেকে এই নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে, যার অর্থ হলো ‘ছাই দ্বীপ’ (Island of Ashes)। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রখ্যাত ভূগোলবিদ টলেমির আঁকা মানচিত্রে গঙ্গা নদীর অববাহিকায় যে কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বদ্বীপের চিহ্ন দেখা যায়, অনেকেই ধারণা করেন এই কুশতহ বা ছাই দ্বীপটিই ছিল আজকের কুষ্টিয়া।
কুষ্টিয়ার বর্তমান প্রশাসনিক মানচিত্রটি একদিনে তৈরি হয়নি, এর পেছনে রয়েছে আড়াইশ বছরের চড়াই-উতরাইয়ের ইতিহাস। ১৭২৫ সালের দিকে এই অঞ্চলটি নাটোরের বিখ্যাত জমিদারির অধীনে ছিল এবং কান্ডানগর পরগনার রাজশাহী ফৌজদারির সিভিল প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে এর দাপ্তরিক পরিচিতি ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭৬ সালে প্রশাসনিক সীমানা পুনর্বিন্যাস করার সময় কুষ্টিয়াকে যশোর জেলার সীমানাভুক্ত করে। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে প্রায় অর্ধশতাব্দী পর, ১৮২৮ সালে এটিকে আবার নবগঠিত পাবনা জেলার অধীনে নিয়ে যাওয়া হয়।
কুষ্টিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৮৬০-এর দশকে, যার নেপথ্যে ছিল এদেশের কৃষকদের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ। ১৮৬১ সালে এই অঞ্চলে নীল চাষিদের ওপর ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচার চরম আকার ধারণ করলে এবং কৃষকদের তীব্র প্রতিরোধ গড়ে উঠলে, পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার কুষ্টিয়াকে একটি স্বতন্ত্র ‘মহকুমা’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর ঠিক এক দশক পর, ১৮৭১ সালে কুমারখালী ও খোকসা থানাকে নদীয়া জেলা থেকে কেটে কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে ভারত উপমহাদেশের বিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত কুষ্টিয়া মূলত অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার অধীনস্থ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বর্ধিষ্ণু মহকুমা হিসেবে টিকে ছিল।

১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তখন নদীয়া জেলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি পূর্ব পাকিস্তানের সীমানায় পড়ে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতভাগের ঠিক পরপরই নদীয়া জেলার এই অংশটিকে নিয়ে একটি স্বাধীন জেলা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং তৎকালীন জেলা প্রশাসক প্রথম দিকে এর নাম ‘নদীয়া জিলা’ হিসেবেই বহাল রেখেছিলেন। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও গবেষক সৈয়দ মুর্তাজা আলী এই জেলার নতুন জেলা প্রশাসক (তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনি দাপ্তরিকভাবে এই জেলার নাম পরিবর্তন করে ‘কুষ্টিয়া জেলা’ হিসেবে অনুমোদন দেন।
জন্মলগ্নে ‘বৃহত্তর কুষ্টিয়া’ জেলাটি তিনটি বিশাল মহকুমা নিয়ে গঠিত হয়েছিল, যেগুলো হলো কুষ্টিয়া সদর, চুয়াডাঙ্গা এবং মেহেরপুর। দীর্ঘকাল এই তিনটি অঞ্চল একই জেলার ছায়াতলে থাকার পর, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জেলা পুনর্গঠন নীতিমালার আওতায় চুয়াডাঙ্গা এবং মেহেরপুর পূর্ণাঙ্গ ও পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এর ফলে, প্রাচীন কুষ্টিয়া মহকুমার মূল ৬টি থানা—কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর, দৌলতপুর এবং ভেড়ামারা নিয়ে বর্তমান ‘কুষ্টিয়া জেলা’ তার আধুনিক ভৌগোলিক রূপ লাভ করে। এই ৬টি উপজেলার প্রতিটিই আজ নিজস্ব লোকসংস্কৃতি, কৃষি ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হয়ে কুষ্টিয়াকে বাংলাদেশের মানচিত্রে এক অনন্য মর্যাদায় টিকিয়ে রেখেছে।
মন্তব্য