বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. ইকবাল হোসেনকে প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে তাঁকে বহাল রাখার দাবিতে সকাল থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালিত হলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সকাল ১০টা থেকে ‘জুলাই যোদ্ধা ও কুষ্টিয়ার সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। একই সময়ে কার্যালয়ের ভেতরে চলছিল দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতি এ তথ্য প্রশাসনের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গতকাল দুপুরের দিকে স্থানীয় সরকার বিভাগ কুষ্টিয়ার উপপরিচালক (ডিডিএলজি) আহমেদ মাহবুব উল ইসলাম এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন ডিসি ইকবাল হোসেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এর নির্দেশনা অনুযায়ী এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর আগে রোববার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়াসহ দেশের পাঁচ জেলার জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ সিদ্ধান্তের পর থেকেই জেলাজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ডিসিকে বহাল রাখার দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের একাংশ মাঠে নামেন। তাঁদের দাবি, ডিসি ইকবাল হোসেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন এবং ‘মানবতার প্রশাসক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
তাঁকে বহাল না রাখলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তাঁরা। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল এর নেতারা বলেন, জেলা প্রশাসক প্রত্যাহার করা সরকারের এখতিয়ার। বদলি ঠেকাতে ‘মব’ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ তোলেন তাঁরা। সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই হাজারো মানুষ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন, যাঁদের একটি বড় অংশ নারী। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একটি মিছিল শহরের মজমপুর রেলগেট এলাকা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাসদস্যদের একটি গাড়ি মোতায়েন ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়।
দিনভর উত্তেজনা থাকলেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। উপস্থিত অনেকেই জানান, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তাঁরা এসেছেন। যদিও দলীয় কর্মসূচির বিষয়টি স্বীকার করেননি জামায়াতের জেলা নেতৃবৃন্দ।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সুজা উদ্দীন জোয়ার্দ্দার গণমাধ্যমকে বলেন, “এটি দলীয় কর্মসূচি নয়, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন।” তবে সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে কেউ অংশ নিতেই পারেন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামিম উল হাসান অপু বলেন, সরকারি চাকরি বদলির চাকরি। বদলি হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হয় এটাই নিয়ম। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি অযৌক্তিক ও অশোভনীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, জেলা প্রশাসক পর্যায়ের কর্মকর্তার বদলিকে কেন্দ্র করে এ ধরনের কর্মসূচি নজিরবিহীন। তিনি অভিযোগ করেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় এসব কর্মসূচি হয়েছে এবং এতে সাধারণ মানুষ বিভক্ত হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, সরকারি চাকরি বদলির চাকরি। কে জেলা প্রশাসক থাকবেন, তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এটিকে কেন্দ্র করে বিভাজন সৃষ্টি করা কাম্য নয়। সবশেষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশ কার্যকর করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে কুষ্টিয়া ত্যাগ করেন মো. ইকবাল হোসেন। ফলে দিনের শুরুতে যে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা ছিল, তা দুপুরের পর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ডিসির বদলি ঘিরে এ ঘটনাপ্রবাহ কুষ্টিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, কর্মসূচি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক চললেও আপাতত জেলায় পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
