বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার শিক্ষা ও পরিবেশ অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিতর্ক আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার কাতলা গাড়ি ডিগ্রী কলেজ এর বাংলা বিভাগের এমপিওভুক্ত শিক্ষক ইখতিয়ার উদ্দিন একটি ইটভাটা পরিচালনার সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়দের দাবি, এই ইটভাটা কেবল আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ নয়, বরং কৃষিজমি, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষকরা মূলত শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশে দায়িত্ব পালন করবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কারণ শিক্ষকতা একটি পেশা নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত হয়। অভিযোগ সত্য হলে এটি পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক যদি অবৈধ বা পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের মাঝে ভুল বার্তা যেতে পারে। ইটভাটা শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পরিবেশগত সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করা হলে কৃষি উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ওই ইটভাটার কার্যক্রমের কারণে আশপাশের জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং ফসলের ফলন কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ভাটার ধোঁয়া ও ছাই বাতাসে মিশে পরিবেশ দূষণ বাড়াচ্ছে, যা শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইখতিয়ার উদ্দিন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইএমবি ব্রিকস নামে একটি ইটভাটার ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন। এ সংক্রান্ত একটি নথির কপি প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও স্থানীয়রা বলছেন, লাইসেন্স থাকার বিষয়টি থাকলেও ভাটাটি পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অন্যান্য অনুমোদন পেয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে কলেজ প্রশাসনের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কলেজের অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমান জানিয়েছেন, শিক্ষক ইখতিয়ার উদ্দিনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি আগে অবগত ছিলেন না। তার মতে, কোনো শিক্ষক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে চাইলে প্রশাসনিক অনুমোদন প্রয়োজন। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক এ ধরনের অনুমতি নিয়েছেন—এমন কোনো তথ্য কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। এই বক্তব্য প্রশাসনিক তদারকির বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একজন শিক্ষক যদি প্রকাশ্যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তবে প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব ছিল বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা। সুশাসনের স্বার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ নজরদারি থাকা জরুরি বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহল মত দিয়েছে। অন্যদিকে, পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশ এর নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদনহীন ইটভাটা পরিচালনা দণ্ডনীয় অপরাধ। ফসলি জমি রক্ষা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানায়, বিষয়টি অবৈধ বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি। এ ধরনের ঘটনা সমাজে শিক্ষকের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে। শিক্ষক সমাজকে সাধারণত নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষক শুধু পাঠদানের মাধ্যম নয়, বরং মূল্যবোধ, সততা ও দায়িত্ববোধের আদর্শ হিসেবেও পরিচিত।
যদি কোনো শিক্ষক আইনবিরোধী বা পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা উচিত। ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে ইতিবাচক বার্তা যাবে। সব মিলিয়ে শৈলকুপার এই ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি শিক্ষা, পরিবেশ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে। সমাজ প্রত্যাশা করে শিক্ষক হবেন নৈতিকতার প্রতীক এবং আইন ও পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণই এ সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে।
