বিশেষ প্রতিনিধি ॥ নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার অধীনে দেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এটি ছিল পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর আগে আর কোনো স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন বা গণভোট নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি। সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ছিলেন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তাঁকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল। অনেকের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু ছিল এই নির্বাচন, সরকার তথা প্রশাসন ছিল সবচেয়ে নিরপেক্ষ।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় আসন ৭৭, কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৪২। যার মধ্যে ২ লাখ ১৭ হাজার ২৬৯ জন পুরুষ, ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৬৯ জন মহিলা এবং ৪ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার। এই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মো. জাকির হোসেন সরকার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মো. আমির হামজা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে মো. আবদুল্লাহ্ আখন্দ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ থেকে মই প্রতীক নিয়ে মীর নাজমুল ইসলাম, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি থেকে হাতি প্রতীক নিয়ে মোছাঃ রুমপা খাতুন এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে ট্রাক প্রতীক নিয়ে মোহা. শরিফুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন।
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল থেকে দেখা যায়, এই আসনে সর্বাধিক জয় লাভ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে দ্বাদশ জাতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ৪ বার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী এবং ৩ বার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে ধানের শীষ মনোনীত প্রার্থী জয় লাভ করেছেন। এছাড়াও এই আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে মাহবুব উল আলম হানিফ ৩ বার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আলহাজ কে.এম. আবদুল খালেক চন্টু ২ বার জয় লাভ করেন।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আলহাজ কে.এম. আবদুল খালেক চন্টু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ২ লাখ ১৫ হাজার ২৭৯ ভোটের মধ্যে ৬২ হাজার ১৮০ ভোট পেয়ে তিনি জয় লাভ করেন।
১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আলহাজ কে.এম. আবদুল খালেক চন্টু ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ২ লাখ ১৭ হাজার ৫০৪ ভোটের মধ্যে ৭২ হাজার ২৬০ ভোট পেয়ে তিনি জয় লাভ করেন।
২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আলহাজ মো. সোহরাব উদ্দিন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৫ ভোটের মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭৪৭ ভোট পেয়ে তিনি জয় লাভ করেন।
২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী কে এইচ রশীদুজ্জামান নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ৩ লাখ ৩ হাজার ৪০১ ভোটের মধ্যে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১২৫ ভোট পেয়ে তিনি জয় লাভ করেন।
২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহবুব উল আলম হানিফ নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৯৪ ভোটের মধ্যে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৭৭ ভোট পেয়ে তিনি জয় লাভ করেন। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহবুব উল আলম হানিফ নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ৩ লাখ ৭২ হাজার ৮৪৮ ভোটের মধ্যে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৫৯০ ভোট পেয়ে তিনি জয় লাভ করেন।
২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাহবুব উল আলম হানিফ নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৪ ভোটের মধ্যে ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৩৩ ভোট পেয়ে তিনি জয় লাভ করেন।
এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহনের বাকি আর মাত্র ৯ দিন। নির্বাচন উপলক্ষ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মো. জাকির হোসেন সরকার এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মো. আমির হামজা জোরালো ভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও অন্য ৪ প্রার্থী ঠিক সেই ভাবে ভোটের মাঠে উত্তাপ সৃষ্টি করতে পারেননি। ধারণা করা হচ্ছে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে ভোট যুদ্ধ হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীর মধ্যে।
সরেজমিনে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটা ওয়ার্ডে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার নির্বাচনী ক্যাম্প রয়েছে। এই দুই প্রার্থীর পক্ষ থেকে দলীয় নেতা কর্মিরা সহ পরিবারের সদস্যরাও নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হয়েছেন। সভা-সমাবেশের পাশাপাশি ভোটাদের বাড়ীতে গিয়েও ভোট প্রার্থনা করছেন তারা। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে নির্বাচনের বাইরে রয়েছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই রাজনৈতিক দল।
সেই সাথে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে দলটির অধিকাংশ নেতা কর্মিরা আত্নগোপনে রয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের ভোট আসন্ন নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে! বিশেষ করে হ্যাঁ বা না ভোটের বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মি সহ সমর্থকরা “না” ভোট কে জয়যুক্ত করার জন্য সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে। বিশেজ্ঞদের মতে, নিজের অস্তিত্ব রাক্ষার্থে এবং গণভোটে “না” কে জয়যুক্ত করতে আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে যাবেন।
বিগত দিনের ভোটের ফলাফল বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ, ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও নৌকা প্রতিকের প্রার্থীরা। সেই হিসাবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা নির্বাচনের ফলফলে বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
