পদ্মায় অবৈধ বালি উত্তোলন: হুমকির মুখে কুষ্টিয়ার ফসলি জমি ও নিরাপত্তা বাঁধ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

পদ্মায় অবৈধ বালি উত্তোলন: হুমকির মুখে কুষ্টিয়ার ফসলি জমি ও নিরাপত্তা বাঁধ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জানুয়ারি ১৩, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় অবাধে চলছে পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালি উত্তোলন। এ কর্মকাণ্ডে পাহারায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনী। এতে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও নিরাপত্তা বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় অবাধে চলছে পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালি উত্তোলন। এ কর্মকাণ্ডে পাহারায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনী। এতে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও নিরাপত্তা বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র দিনের পর দিন নদীর গভীর থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালি তুললেও প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ নেই।

কুষ্টিয়াঘেঁষে বয়ে চলা পদ্মা অংশে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু তা অমান্য করেই রাজশাহী ও কুষ্টিয়ার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী চক্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় অবৈধ বালি ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। এর প্রতিবাদ করতে গেলেই সাধারণ মানুষকে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। অস্ত্রের মুখে নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন এলাকাবাসী। সরজমিনে দেখা যায়, দৌলতপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে রাত-দিন একাধিক ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে, বাড়ছে তীরভাঙনের ঝুঁকি। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, অনেক এলাকায় ফসলি জমি এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

আবার কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বালি ফেলায় ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চৌদ্দহাজারের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, ‘বাঁধের পাশ থেকেই বালি তোলা হচ্ছে, অথচ কেউ থামাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা একদিন বসতভিটাটাই হারাব।’ তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ‘মেসার্স সরকার ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান অবৈধ এ বালি ব্যবসার নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় বৈধভাবে বালি উত্তোলনের জন্য ২৪ একর জমি ইজারা পায়। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত বালি না থাকায় পদ্মার অপর পাড় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ও ফিলিপনগর এলাকায় অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছে। এ কাজে সহায়তা করছে স্থানীয় ‘গিট্টু বাহিনী’ ও ‘সোহাগ বাহিনী’। জানতে চাইলে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সবুর আলী বলেন, ‘ইজারাপ্রাপ্ত এলাকার বাইরে বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

অবৈধ বালি উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। ভেড়ামারা উপজেলার ফয়জুল্লাহপুর ঘাটে গত ১১ জুলাই স্পিডবোটে করে এসে একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে স্থানীয় আমরুল গাইন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় ভেড়ামারা থানায় মামলা করা হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। স্থানীয়রা জানান, ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালি উত্তোলনের ফলে হাজারো পরিবার বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। কোনো তথ্য প্রকাশ পেলেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে সন্ত্রাসীরা হুমকি দেয় ও গুলি ছোড়ে।

আতঙ্কগ্রস্তরা তাই অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধ এবং সন্ত্রাসী চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এমনকি নৌ-পুলিশের যোগসাজশে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ এনেছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পদ্মা নদীর দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার বিএম নুরুজ্জামান বলেন, ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেই সঙ্গে অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধে অভিযানও জোরদার করা হবে।’ কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, নদী থেকে অবৈধ বালি উত্তোলনের ফলে পদ্মার তীরবর্তী প্রতিরক্ষা বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাঁধের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে। এটি হলে পুরো এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, ‘আমি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। তবে অবৈধ কার্যকলাপের তথ্য পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অবৈধ বালি উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিতই অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে চক্রটি প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় তারা পালিয়ে যায়। শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ যৌথ অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। নদী বিশেষজ্ঞরা জানান, নদীতলদেশের বালু প্রাকৃতিক রক্ষাকবচের মতো কাজ করে, যা স্রোতের আঘাত থেকে নদীর পাড়কে রক্ষা করে এবং ভাঙন প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি নদীর জলজ প্রাণ তথা মাছের আবাস ও খাদ্য তৈরিতে বালি কিংবা নুড়ি পাথর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘এক জায়গায় অপরিকল্পিত গর্ত বা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অতিমাত্রায় খনন করলে তার প্রভাব পুরো নদীতেই পড়ে। সেক্ষেত্রে নদীর গতিপ্রকৃতি বদলে যেতে পারে, দেখা দিতে পারে ভাঙন। তাই অবিলম্বে অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধ না হলে কুষ্টিয়া ও পাবনার কৃষি ও নদীতীরবর্তী জনপদ বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।