বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা নদী তীরবর্তী মরিচা ইউনিয়নের চৌদ্দহাজার মৌজায় হাইকোর্ট ও বিআইডব্লিউটিএর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে ড্রেজার ও বলগেট দিয়ে চলছে অবৈধভাবে রমরমা বালু উত্তোলন। এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনী, যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে রাজশাহী ও কুষ্টিয়া জেলার নিষিদ্ধঘোষিত একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী চক্র। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে হাজারো পরিবার। চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রক্ষা বাঁধ। তবুও প্রশাসন রয়েছে নিরব।
কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বলছেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের ছত্রছায়ায় ও নিষিদ্ধঘোষিত নেতারা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনীদের দিয়ে এই কার্যক্রম চলাচ্ছে। যার প্রতিবাদ করলেই বন্দুকের মুখে পড়তে হয়। ইতিমধ্যে এই চৌদ্দহাজার মৌজাতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও আধিপত্য বিস্তারের কারনেই ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে। পরে পদ্মার এপার ওপার পুলিশ সহ যৌথবাহিনির অভিযানে মাঝে কিছুদিন স্বস্তি ছিলো পদ্মা নদীতে। কিন্তু এরপরো এই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও দখলদারিত্বের কারনে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ড হয়েছে বলে জানাগেছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নিষিদ্ধ ঘোষিত সাবেক নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা কয়েকটি সন্ত্রাসী বাহিনীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে এই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে! তবে নেতৃত্বে ‘মেসার্স সরকার ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই অবৈধ বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি রাজশাহীর লক্ষীনগর মৌজায় ২৪ একর বৈধ ইজারাভুক্ত এলাকা পেলেও,উক্ত এরিয়াতে বালু উত্তোলন মত কোনো বালু নেই। তাই তারা পদ্মার এপার কুষ্টিয়ার মরিচা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে বালু উত্তোলন করছে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গিট্টু সোহাগ বাহিনীর লোকজনদের ব্যাবহার করে।
গত ১১ জুলাই ২০২৫, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ফয়জুল্লাহপুর ঘাটে সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী স্পিডবোর্ডযোগে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে স্থানীয় কামরুল গাইনের ভাই আমরুল গাইন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় ভেড়ামারা থানায় মামলা দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি (মামলা নম্বর-৬, তারিখ-১১/০৭/২০২৫)। জনগণের দাবি: বালু উত্তোলন বন্ধ ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা হোক। ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন, তারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি চৌদ্দহাজার মৌজায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা হোক এবং সন্ত্রাসী বাহিনীর আশ্রয়স্থল নিশ্চিহ্ন করা হোক।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা আইনের আওতায় গেলেই প্রানহানি হবেনা বলে মন্তব্য করে।এ বিষয়ে ‘মেসার্স সরকার ট্রেডার্স’-এর মালিক এস.এম. একলাস আহমেদ জানান, “আমি রাজশাহীর বাঘায় বৈধভাবে ইজারা নিয়েছি। যদি কেউ ইজারার বাইরে গিয়ে অন্য জেলায় বালু উত্তোলন করে, সেটা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমি বিষয়টি দেখছি।”প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ,হাইকোর্ট ও পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বিআইডব্লিউটিএর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসনের নিরবতা এখন জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নৌ-পুলিশের জনবল সংকট এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
জনগণের জানমাল, পরিবেশ ও নদী রক্ষার্থে অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।অন্যথায় দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ও মরিচা ইউনিয়ন চরাঞ্চলের জনগন চৌদ্দহাজার মৌজার জমিমালিকরা আন্দোলন করবে অনিবার্য। উল্লেখিত বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ এর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমি সদ্য এসেছি, ঘটনা শুনেছি, তবে বাঘা অঞ্চলের লোকজনের নাকি ইজারা নেওয়া, এটা অনেকে বলে, কিন্তু দৌলতপুরের মধ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে অবশ্যই ব্যাবস্থা গ্রহন করবো।
এদিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কাছে জনতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, যেই এরিয়াতে ইজারাপ্রাপ্ত, সেই এরিয়াতে বাদে যেখানেই বালু উত্তোলন হোক, সেটা সম্পূর্ন অবৈধ। তবে ব্যাবস্থা গ্রহন করবো। তবে রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, এখলাস মোল্লার প্রাপ্ত ২৪ একরের বাইরে বালু উত্তোলন করলে সেটা অবশ্যই অবৈধ,তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো। তবে পদ্মা নদীর অধিনস্থ দায়িত্বপ্রাপ্ত নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার বিএম নুরুজ্জামানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, অস্ত্রসজ্জিত সন্ত্রাসীরা যদি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে, তাহলে অবশ্যই ব্যাবস্থা গ্রহন করবো, আইসিকে বলে দিচ্ছি,আপনি তথ্যগুলো দেন।
