বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির আস্থাভাজনে প্রকল্প পরিচালক ড. নওয়াব - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির আস্থাভাজনে প্রকল্প পরিচালক ড. নওয়াব

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ডিসেম্বর ১২, ২০২৫

ইবি প্রতিনিধি ॥ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়-দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের ঢেউ গেলেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক ড. নওয়াব আলী রয়ে গেছেন অপরিবর্তিত। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনীতির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে জুলাই আন্দোলনের পক্ষের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা।  বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, ড. নওয়াব আলী ২০২২ সালের ৩০ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি ৫৩৭ কোটি ৭ লক্ষ টাকার মেগা প্রজেক্টের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এসব প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তিনি বরাবরই প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে ড. নওয়াব আলী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিল। বিভিন্ন সময় নামে বেনামে প্রকল্পের টাকা আত্মস্যাৎ করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি প্রফেসর ড. মো. আলাউদ্দিনের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়োগ নীতিমালা (চাকরী বিধি) ভঙ্গ করে তার স্ত্রীকে চাকরী দেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। জুলাই অভ্যুত্থান বিরোধী কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণ করায় গত ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১ তম সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৩০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বহিষ্কার এবং ৩৩ জন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে বহিষ্কার ও সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

অভ্যুত্থানের বিরোধীতা করলেও ভাইস চ্যান্সেলর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর আস্থাভাজন হওয়ায় ড. নওয়াব আলীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মাঝে। একই অপরাধে অপরাধী হওয়া স্বত্তেও তার বিরুদ্ধে কোনো প্রদক্ষেপ না নেওয়ায় অভ্যুত্থানবিরোধী ভূমিকা চিহ্নিতকরণ কমিটির তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। ফাইল গায়েবের অভিযোগ: ফ্যাসিবাদী তৎপরতা, জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় বিরোধিতা এবং দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ৫ মার্চ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালকের পদ থেকে ড. নওয়াব আলীকে অব্যাহতি দিয়ে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে এস্টেট অফিসের উপ-পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে অব্যাহতির পরের দিন ৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির দিনে দফতরটির ফাইলপত্র বাসায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক এই পরিচালকের বিরুদ্ধে।

সূত্রমতে, অভিযুক্ত নওয়াব আলী গত ৬ মার্চ ছুটির দিনে দফতরটির বিভিন্ন ফাইলপত্র তিনটি মিনি ব্যাগ ও একটি বড় বস্তাবন্দি করান। এসব ফাইলপত্র বের করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়। গোপনে প্রধান প্রকৌশলীর গাড়ি ব্যবহার করে ডরমিটরির সংলগ্ন ২ নম্বর গেট দিয়ে ফাইলপত্র ক্যাম্পাসের বাহিরে নিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠে। সোয়া ছয় কোটি টাকার প্রমাণ মিললেও শাস্তি হয়নি জড়িতদের: দুই বছর আগে ভুয়া বিলের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের (৩য় পর্যায়) বিলে সোয়া ৬ কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ উঠে প্রকল্প পরিচালক নওয়াব আলীসহ কয়েকজন প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তদন্তে তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. শেখ আব্দুল সালাম ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

পরবর্তী বছরের ৯ মার্চ জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে নওয়াব আলীসহ সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি এমপ্লয়ি ইফিসিয়েন্সি এন্ড ডিসিপ্লিন রুলস’ এর আলোকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনি তদন্ত কমিটি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি প্রশাসন। পরবর্তীতে উক্ত অনিয়মের বিষয়ের অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে সুনির্দিষ্ট শাস্তির ধরণ উল্লেখপূর্বক প্রতিবেদন প্রদানের জন্য আরেকটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের ফলে পটপরিবর্তনের কারণে উক্ত কমিটি কোনো ধরণের প্রতিবেদন দাখিল করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন প্রশাসন নিয়োগ প্রাপ্ত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্বের সকল দূর্নীতি বিচার করার জন্য দাবি জানিয়েছিল জুলাই অভ্যুত্থানপন্থি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু এবিষয়ে প্রশাসনের চরম অনিহা ছিলনা বলে দাবী তাদের।

এদিকে চলতি বছরের ২৮ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের বিগত ১৫ বছরের অনিয়ম ও দূর্নীতির প্রতিবেদন উপদেষ্টার নিকট দাখিলের জন্য নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। নির্দেশনা দেওয়া স্বত্তেও  আগের প্রশাসনের সময় অনিয়ম ও দূর্নীতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ক্যাম্পাসের একাধিক শিক্ষক দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকারে ড. নওয়াব “ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ” হিসেবে সুবিধাজনক প্রশাসনিক অবস্থানে ছিলেন। ভিসির সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকায় তিনি নতুন প্রশাসনেরও আস্থাভাজন। একজন সিনিয়র শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,“নওয়াব আলী খান আগের সরকারের সময়ে বিশেষ সুবিধায় ছিলেন এটা ক্যাম্পাসের সবাই জানে।

প্রশ্ন হচ্ছে, পটপরিবর্তনের পরও তিনি একই ক্ষমতায় বহাল থাকলেন কীভাবে?” ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। কয়েকজন নেতার অভিযোগ, পটপরিবর্তনের পর প্রায় সকল প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন আনা হলেও প্রকল্প পরিচালকের পদে নিয়োগ দেওয়ার মত যোগ্য লোক বিশ্ববিদ্যালয়ে না থাকার দোহাই দিয়ে উক্ত পদে নওয়াব আলীকে বহাল রেখেছে বলে জানান তারা। এবিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাব’র সভাপতি প্রফেসর ড. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘এটা নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে। ৫ আগস্টের পর থেকে সকল ছাত্রসংগঠন নওয়াব আলী খানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে । আমরা সেই শুরু থেকে উনার বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলে আসছি। আজকেও আমরা বলেছি কোনো ফ্যাসিস্ট যেন পদে না থাকে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ভাইস চ্যান্সেলর এটার উত্তর দিতে বাধ্য নয় আপনার কাছে।