প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ডিসেম্বর ৩, ২০২৫

কুষ্টিয়ায় এমটিএফ এর প্রতারক চক্র আবারো সক্রিয় (প্রথম পর্ব)

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ এমটিএফই-কে একটি মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ভিত্তিক প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। এই প্রতারণাটি একটি অ্যাপ-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এর মাধ্যমে মানুষকে অর্থ বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করা হয়, যা পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকে প্রতারণা করে কেড়ে নেওয়া হয়। মূলত একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কাজ করে, যা মানুষকে বিভিন্ন আর্থিক কার্যকলাপে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করে। এ ধরনের স্কিমে বিনিয়োগ করার আগে ভালোভাবে যাচাই করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

এদিকে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে কুষ্টিয়ার একটি অভিজাত রেস্টেুরেন্টে এমটিএফই এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে প্রধান অতিথি করে এবিএম রফিক উদ্দিন (রফিকুল্লাহ কালবী) কে কুষ্টিয়া জোনের  প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কুষ্টিয়াতে যাত্রা শুরু করে। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এই এবিএম রফিক উদ্দিন। প্রতিষ্ঠানটি যাত্রার পর কুষ্টিয়ার বিভিন্ন রেস্টেুরেন্টে জমকালো সভার মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করতে থাকে এবং উদ্বোধনের কয়েকদিনের মধ্যেই গ্রাহকের সংখ্যা তড়িৎ গতিতে রাড়তে থাকে।

প্রথম দিকে কিছু গ্রহক টাকা পাইলেই, কিছু দিন পর নানান সমস্যা দেখিয়ে গ্রাহকদের পাওনা টাকা আটকে রাখে এমএলএম কোম্পানীটি। যার ফলে কুষ্টিয়া অঞ্চলের কয়েক হাজার গ্রহকের প্রায় শত কোটি টাকার বিনিয়োগ লোপাট করে নেয় কোম্পানীটি। এদিকে পরিস্তিতি বেগতিক দেখে এবিএম রফিক উদ্দিন সহ এই প্রতারক চক্রের সবাই আত্নগোপনে চলে যায়। প্রতারণার শিকার হয়ে আবীর হোসেন স্বাধীন সহ অনেক গ্রহকরা থানায় অভিযোগ দিয়ে পাননি ন্যায় বিচার। আবীর, শোবন পারভেজ ও ফাতেমা আলো নামের তিন গ্রহক ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট তাদের বিনিয়োগকৃত ৩ লাখ ২১ হাজার টাকা ফিরে পেতে কুষ্টিয়া মডেল থানায় অভিযোগ দিয়েও কোন ফল পান নাই।

দুই বছর পর সম্প্রতি স্যোসাল মিডিয়ায় এমটিএফই এর প্রতারণার বিষয়টি আবারও উঠে আসে। সেই সাথে প্রতিষ্ঠানটির কুষ্টিয়া জোনের নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম রফিক উদ্দিন কালবী সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট তারিখে কুষ্টিয়া পৌর সভার চৌড়হাসের রাজিব শাহ নামের এক যুবক এমটিএফই কোম্পানীর কুষ্টিয়া জোনের সিইও রফিকুল্লাহ কালবীর বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া মডেল থানায় ২৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার প্রতারণার অভিযোগ করলেও আজ অবধি থানা থেকে মামলা নেওয়া হয়নি। যার ফলে টাকাও ফিরে পাননি রাজিব শাহ। এবিএম রফিক উদ্দিন কালবী আওয়ামী লীগ শাসন আমলে একজন আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মি ছিলেন। শেখ মুজিবর রহমানের ব্যানার ঝুলিয়ে পালন করেছেন ১৫ই আগস্ট শোক দিবসও। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে কর্মরত হিসাবে পরিচিত ছিলো সে।

এরপর এমটিএফই-কে একটি মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কোম্পানী কুষ্টিয়াতে এনে রাতারাতি বনে যান হিরো। তার মিষ্টি কথার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারায় অনেকে। সেই সময় একাধিক সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি উঠে আসে এবং গা ঢাকা দেন রফিক উদ্দিন কালবী সহ তার সহযোগীরা। কুমারখালীর গণমাধ্যম কর্মি ও এশিয়ান টিভির কুমারখালী প্রতিনিধি কে এম আর শাহীনের দেওয়া তথ্য মতে, প্রতিষ্ঠানটি শুধু কুমারখালী ও আশে পাশের এলাকা থেকে কয়েকশত গ্রহকের প্রায় দুই কোটি টাকা আত্নসাৎ করে। তবে আত্নসাৎকৃত অর্থের পরিমান ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। কুষ্টিয়ার ৬টি উপজেলা থেকে কোম্পানীটি আত্নসাৎকৃত অর্থের পরিমান শত কোটি টাকার উপরে।

কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সদস্য ও দৈনিক হাওয়া পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শেহাব উদ্দিন আহম্মেদ একটি ফেসবুক পোষ্টের কমেন্টেস এ জানান, “আমার বন্ধু’র বোন শামসুন্নাহার (৩৮) আমলা, মিরপুরের বাসিন্দা। এই চক্রের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা খুইয়ে আমার শরণাপন্ন হয়েছিল। কুমারখালীসহ কুষ্টিয়ায় অফিস ছিল। আমি সেসময় ছোট বোন শামসুন্নাহার কে সাথে নিয়ে অফিস বন্ধ পাই এবং কাউকে খুঁজে পাইনি। আবার এরা পুরনো মদ নতুন বোতলে ভরে কুষ্টিয়া শহরে সেমিনার করছে! বিএনপি-জামাতের কিছু লোকও যোগার করেছে। এই ব্যবসা সরকারী ভাবে অবৈধ। কেউ অনলাইনে ডলার কিনবেন না।”

অনুসন্ধানে জানা যায়, কুষ্টিয়া জোনের প্রধান নির্বাহী রফিক উদ্দিন কালবীর মাধ্যমে প্রথমে এই এমটিএফই অ্যাপস কুমারখালীতে নিয়ে আসে পান্টি ইউনিয়নের পান্টি গ্রামের মৃত আকবার আলীর ছেলে মেহেদী। পরে সহযোগী মিজান ও মাসুদ টিম লিডার (অজ্ঞাত) কুমারখালী বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সাধারণ নিরীহ শত শত মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। মূলত এই কুমারখালী উপজেলায় মেহেদির কথামতো টিমলিডার সেজে এমটিএফই অ্যাপসে কাজ করতে থাকে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রটি। এই প্রতারক সংঘবদ্ধ চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপসে গ্রুপ খুলে শত শত গ্রাহকদের সাথে নানা রকমের তথ্য আদান-প্রদান ও কথা বার্তা আলাপ আলোচনা করে পরিচালনা করত।

২০২৩ সালের শুরুতে কুমারখালী উপজেলার দয়রামপুর, ঝাউতলা, বাটিকামারা, খয়েরচারা, পাথরবাড়ীয়া, জিলাপীতোলা, তেবাড়িয়া, আগ্রাকুন্ডা,সদকী,মন্দিরপুর, তারাপুরসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটা গ্রাম-গঞ্জে এই অ্যাপস টি যুবসমাজ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঝড় তুলে। কোন কাজ না করে রাতারাতি ধনী হওয়ার মোহে একের পর এক একাউন্ট খুলতে থাকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ নিরীহ মানুষেরা। কিন্তু একই বছরের ১৮ আগস্ট  (শুক্রবার) সকাল হইতে মেহেদী, মাসুদ ও মিজানের মাধ্যমে যারা এমটিএফ ই অ্যাপসে কুমারখালীর শত শত বিনিয়োগকারীদের ব্যালেন্স শূন্য এবং ঋণাত্মক দেখাই।

পরে কুমারখালী উপজেলার দায়িত্বে থাকা মেহেদী মিজান মাসুদের সাথে গ্রাহকরা যোগাযোগ করলে তারা সমাধান করার আশ্বাস দিলেও পরে তালবাহানা শুরু করে। মেহেদী কুমারখালীর বাস স্টান্ডের সিঙ্গার শোরুম এর দ্বিতীয় তলায় বসে এমটিএফই এর কর্যক্রম চালাতে বলে জানা গেছে। সেই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, “পান্টি গ্রামের বেশকিছু ব্যক্তিরা জানান, আমরা এমটিএফই অ্যাপসের সম্পর্কে জানতাম না। আমাদের সাথে এই অ্যাপসের পরিচয় করিয়ে দেয় মেহেদী। আরও এখানে বিনিয়োগ করলে কোন লোকসান হওয়ার আশঙ্কা নাই বলে ও তিন মাসের মধ্যে কিছু হলে টাকার ফেরতের গ্যারান্টি ও দেয়। পরে মেহেদির মাধ্যমে আমরা ৫ থেকে ৭ লক্ষ টাকা ডলার করে ডিপোজিটে বিনিয়োগ করি।

এছাড়াও কুমারখালীর এক ভুক্তভোগী সেই সময় গণমাধ্যমকে  জানিয়েছিলেন, “আমি গত তিন সপ্তাহ আগে মেহেদি, মাসুম ও মিজানের কথা মতো কুমারখালীর বাসস্টান্ডের সিঙ্গার শোরুম এর দ্বিতীয় তলায় একটি সেমিনারে আমাকে দাওয়াতের মাধ্যমে ডেকে নেয়। তারপর ঐ সেমিনারে আমার সাথে যারা গিয়েছিল তারাও আমার সাথে এমটিইএফ অ্যাপে নগত টাকা হাতে দিয়ে ডলারে ডিপোজিট করি। আরোও বলে তিন মাসের মধ্যে টাকা সব উঠে যাবে ও তিনমাসের মধ্যে যদি কোন সমস্যা হয় আমাকে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেয়। পরে ধার দেনা ও ঋণ করে আমি ও আমার চাচতো বোন, ভাইসহ প্রায় ২০ জনকে ডিপোজিট করেছি তাদের মাধ্যমে। অ্যাপ বন্ধের দশ দিন আগে থেকেই অ্যাপের বিভিন্ন রকম সমস্য দেখায়। পরে তাদের কে জানালে বলে সার্ভারের সমস্যাসহ আরো বিভিন্ন রকম সমস্যা কথা বলে ও ঠিক হয়ে যাবে এই আশ্বাস ও দেয়।

এরপর ২০২৩ সালের ১৮ আগস্ট সকালে অ্যাপস খুললে দেখতে পাই ডিপোজিটের ডলার গুলো ঋণাত্মক ও শূন্য দেখাচ্ছে। পরে বিষয়টি ফোন করে মেহেদি কে বললে সন্ধার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে বলে ফোন কেটে দেয়। তার পর থেকে মেহেদি ফোন নাম্বার বন্ধ রেখে দেশেই আত্মগোপনে চরে যায়। সেই সময় মাসুম ও মিজান সৌদি আরব ওমরা হজ্ব করতে গিয়েছিলো। কুষ্টিয়া জোনের নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম রফিক উদ্দিন কালবী মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কোম্পানী এমটিইএফ এর সরণীর উপরে থাকায় তার সাথে টিম লিডারদের ছাড়া সরাসরি দেখা বা কথা বলার কোন সুযোগ ছিলো না।

আর এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ দিন আত্নগোপনে থাকা রফিক উদ্দিন কালবী ২০২৪ সালের আগস্টের পর বেশ পাল্টি সাংবাদিকতা তকমা লাগিয়ে কুষ্টিয়াতে প্রত্যাবর্তন করে। প্রত্যাবর্তনের পর কৌশলী রফিক উদ্দিন কালবীকে কুষ্টিয়া বেশ কিছু বিএনপি নেতার অফিসে ধর্না দিতে দেখা যায়। সেই সাথে তার নিজের একটি ফেসবুক পেইজ ভিডিও কন্টেন্ট পোষ্ট করে নিজের ফ্যান ফলোয়ার তৈরি করে। কুমারখালী যদুবয়রা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক মামুন এবং কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লিমনের সাথে তাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠনে প্রায়সই দেখা যায়।

এছাড়াও ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমীতে তাকে এমটিইএফ এর কিছু গ্রহক আটক করে উত্তমমাধ্যম দেয় বলেও জানা যায়। ২০২৩ সালের প্রথম আলো অনলাইনে “ এমটিএফই অ্যাপে প্রতারণার বিষয়ে তথ্য চায় সিআইডি” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। যেখানে “মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) গ্রুপ ইনকরপোরেটেডে অনলাইন প্রতারণার বিষয়ে তথ্য চেয়েছিলো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এমটিএফই নামের একটি মুঠোফোন অ্যাপে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের বহু মানুষ প্রতারিত হয়েছেন বলেও ঐ সংবাদে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়াও প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে ঐ প্রতিবেদনে। এমন প্রেক্ষাপটে সিআইডি গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে এমটিএফইর প্রতারণার বিষয়ে তথ্য চেয়ে পাঠায়। এদিকে এমটিএফই অ্যাপে প্রতারণার সাথে সরাসরি জড়িতরা কুষ্টিয়া শহর সহ জেলায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসনের নিরব ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।