ইবি প্রতিনিধি ॥ সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী ভূমিকায় থাকা ৩০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত ও ৩৩জন ছাত্রলীগ নেতাকে বহিস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এদের মধ্যে ১৯ জন সিনিয়র ও জুনিয়র শিক্ষক শিক্ষক। অভিযোগ রয়েছে, এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে গডফাদাররা । এরা জামাত ও বিএনপির ছত্রছায়ায় বেঁচে গিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। জুলাইয়ের পক্ষের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন , যেসব গডফাদাররা ৫ আগস্টের আগে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল তারা অনেকেই ছুটি নিয়ে দেশের বাহিরে যাচ্ছে ও অনেকেই দীর্ঘমেয়াদী ছুটির প্রক্রিয়ায় আগাচ্ছে। ফ্যাসিবাদের গডফাদারদের কোনভাবেই পালাতে দেওয়া যাবে না এবং প্রশাসন যেন কোনোভাবেই তাদের সেফ এক্সিট না দেয়।
এদিকে যেসব ফ্যাসিস্টকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সেই শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নেতাদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি মহল। সুকৌশলে শিক্ষার্থীদের মাঠে নামাচ্ছে ফ্যাসিবাদীরা শক্তি। তারা সুবিধাভোগী কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থী ও নবীন শিক্ষার্থীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করে ফ্যাসিবাদীদের বাঁচাতে বিভাগের ব্যানারে আন্দোলনে নামাচ্ছে। আরও জানা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগই এখন ফ্যাসিবাদ নিয়ন্ত্রিত। বরখাস্ত শিক্ষকদের ঘনিষ্ঠ ছাত্রদের দ্বারা জুনিয়রদের বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করে আন্দোলনে নামানোর চেষ্টা ও স্বাক্ষর নেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে কয়েকটি বিভাগে।
এছাড়া মহলটি বিভিন্ন ইস্যুকে ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরীর চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, গত ১৫ মার্চ জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের বিরুদ্ধে ভূমিকায় অবতীর্ণ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের চিহ্নিতকরণে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে প্রশাসন। পরে প্রত্যক্ষদর্শী কর্তৃক প্রদত্ত লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ, বিভিন্ন তথ্যচিত্র, ভিডিও এবং পত্রিকার খবরের ভিত্তিতে এসব শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের জুলাই-আগস্ট বিপ্লববিরোধী ও নিবর্তনমূলক কার্যকলাপের সংশ্লিষ্টতা পায় কমিটি। কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১ তম সিন্ডিকেট সভায় দোসরদের বিষয়ে শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিদ্ধান্তে ৩০ শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত ও ৩৩ ছাত্রলীগ নেতাকে বহিষ্কার ও সনদ বাতিল করা হবে বলে জানা গেছে। জানা যায়, আইন বিভাগের প্রফেমর ড. শাহজাহান মন্ডল ও প্রফেসর ড. রেবা মন্ডল বিরুদ্ধে নেওয়া বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে শনিবার (১ নভেম্বর) মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন বিভাগটির শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক মাজেদুল ইসলাম নয়ন ও হিউম্যান রিসার্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক শহিদুল ইসলামেরও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারে (২ নভেম্বর) মানববন্ধন করে বিভাগ দুটি। অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শিক্ষকের জন্য আরেক ফ্যাসিস্ট ছাত্রলীগ কর্মী সজিব, এইচ আর এম বিভাগের মানববন্ধনের নেতৃত্ব ছিল।
তার বিরুদ্ধে মাদক, সাংবাদিকের ফোন কেড়ে নেওয়া, জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধচারণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তবে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চাওয়া শিক্ষকদের জুলাই আন্দোলন চলাকালীন আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন শাপলা ফোরামের জুলাই আন্দোলন বিরোধী র্যালি ও সমাবেশে দেখা গেছে। র্যালিতে জুলাই আন্দোলনকে ‘নৈরাজ্য’ আখ্যা দিয়ে ‘শেখ হাসিনার ভয় নেই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ স্লোগান দিতে দেখা যায়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কেউ কেউ দীর্ঘ ছুটি নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে চাইছে; তাদের যেন প্রশ্রয় না দেওয়া হয়। সাবেক ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারারসহ শাপলা ফোরাম ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতারা ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল, কেউ প্রকাশ্যে, কেউ গোপনে। তারা দুর্নীতি, নিয়োগ বানিজ্য, নারী নিপীড়ন থেকে শুরু করে অপছন্দের শিক্ষার্থীকে ফেল করানোসহ বহু কুকর্মে জড়িত। প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে এই ফ্যাসিস্টদের কাউকেই ছাড় দেওয়া যাবে না। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে প্রশাসন জুলাই অভ্যুত্থান বিরোধী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নেতাদের শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু একটি পক্ষ এসব ফ্যাসিস্টদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বিভিন্নভাবে ইন্ধন দিয়ে ও চাপ প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামানোর চেষ্টা করছে। তারা আরো বলেন, উল্লেখযোগ্য ফ্যাসিস্ট সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুস সালাম, প্রফেসর ড. হারুন অর রশিদ আসকারী, সাবেক প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমান, প্রফেসর ড. মাহবুবুর রহমান, সাবেক ট্রেজারার প্রফেসর ড. সেলিম তোহা, প্রফেসর ড. আলমগীর হোমেন, সাবেক প্রক্টর প্রফেসর ড. শাহাদাৎ হোসেন আজাদ, সাবেক প্রেস প্রশাসক সাজ্জাদ হোসেন, ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাত প্রমুখ যারা বিভিন্ন সময়ে নানা অপকর্মে জড়িত ছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ বা তাদের কাছের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বোর্ডে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদের বিষয়ে প্রশাসন কোন ব্যবস্থা না নিলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। জুলাই আন্দোলন চলাকালীন ফ্যাসিস্ট শিক্ষকদের অবস্থান সম্পর্কে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাবেক সহ-সমন্বয়ক ইয়াশিরুল কবির সৌরভ বলেন, জুলাই আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য শিক্ষকদের নির্দেশে হলগুলো বন্ধ করা হয়। আন্দোলনকারীদের জঙ্গী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের চেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকি প্রশাসন দ্বারা আমাদের হামলা করার নকশাও করেছিল। আন্দোলনকারীদের বার বার হুমকি প্রদান করেছিল।
শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করলে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা ‘আর নয় হেলাফেলা এবার হবে ফাইনাল খেলা’ স্লোগান দিয়ে মিছিল করেছে। কাউকে সেফ এক্সিট দেওয়ার চেষ্টা হলে সে চেষ্টাকে রুখে দেবে ইবির ছাত্র সমাজ, মন্তব্য করেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক এস এম সুইট। ইবি ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ। ফ্যাসিস্ট ভিসি, প্রো-ভিসি ও প্রশাসনের শীর্ষে থেকে যারা ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিলেন, তাদের নাম নেই তালিকায়। ৪ আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলনবিরোধী মিছিলে অংশ নেওয়া বহু শিক্ষক-কর্মকর্তার নামও বাদ গেছে। বরং দুর্নীতি করে কোটিপতি হওয়া ও হামলা-মামলার নির্দেশদাতারা প্রমোশন পেয়েছেন।
অর্থের বিনিময়ে নাম বাদ দিয়ে প্রশাসন ফ্যাসিস্টদের রক্ষা করছে। ধিক্কার জানাই ইবির বর্তমান প্রশাসনকে! বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন ইউট্যাব ইবি শাখার সভাপতি প্রফেসর ড. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, যারা জুলাই বিপ্লবকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র করেছে ও আন্দোলনকারীদের হুমকি দিয়েছে। তাদের শাস্তি হোক এটা সকলের দাবি। তবে কোন নিরাপরাধ ব্যক্তি যাতে শাস্তি না পায় সেটাও দেখতে হবে। জুলাই বিরোধী র্যালি ও সমাবেশে সরাসরি অংশগ্রহণ করা বরখাস্ত শিক্ষকদের পক্ষে আন্দোলনকারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক বিভাগে শিক্ষকের কিছু ঘনিষ্ঠ শিক্ষার্থী থাকে।
যারা শিক্ষকের ন্যায় অন্যায় যাইহোক শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান করে। এটা সেটারই অংশ। এ বিষয়ে ভিসি প্রফেসর ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিরোধী বিতর্কিত ভুমিকার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে আমরা আরো একটি কমিটি গঠন করবো। সেই কমিটি বিবেচনা করবে কাকে কতটুকু শাস্তি দেয়া যায়। তবে ফ্যাসিস্টের প্রশ্নে কোন ছাড় হবে না।
