বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ১৫ বছরে শূন্য থেকে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক বনেছেন সাবেক কুমারখালী পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুজ্জামান অরুণ। এক সময় তার পরিবারের ভরণ-পোষণ জোগাতেই হিমশিম খেতেন। হঠাৎ তার এমন বিত্তশালী হওয়া রূপকথার গল্পকেও যেন হার মানায়। স্থানীয়দের দাবি, পৌর মেয়র হাওয়ার সুবাদে টেন্ডারবাজি, জমি দখল, কমিশন বাণিজ্যের হোতা সামসুজ্জামান অরুণ। এছাড়াও জমি দখল, সালিশ বৈঠক, ঠিকাদারি কাজে অনিয়ম, থানায় তদবিরসহ নানা অপরাধ-দুর্নীতিতেও জড়িত ছিলেন তিনি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান সামসুজ্জামান অরুণ।
তার বিরুদ্ধে কুমারখালী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে জালিয়াতি ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে শিক্ষক-কর্মচারী ২২ জন কে টাকার নিয়োগের অভিযোগে। দুদক ৮ মার্চ ২০২৩ সালে মামলা করেন। মামলায় অপরাধমূলক অসদাচরণ করে পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে রেকর্ডপত্র সৃজন এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৮-এর বিধি-বিধান এবং সরকারি প্রজ্ঞাপনের নিয়মভঙ্গ করে কুমারখালী সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক/কর্মচারী পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। সামসুজ্জামান অরুণ ও তার ছেলে প্রতীক’ প্যাসিফিক এন্টারপ্রাইজের ‘ ভাউচারে ।
কুমারখালীর ১৪৭ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ লাখ ৯৩ হাজার টাকার ১৪৭টি বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন কেনাকাটায়ও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কুমারখালী বাজারে পৌরসভার দোকান বরাদ্দে অনিয়ম করে কোটি – কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। কুমারখালী বাজারের মধ্যে নামে বেনামে অনেক দোকানের মালিক হয়েছেন সামসুজ্জামান অরুণ। তার বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি সহ হেনও কোন কর্মের অভিযোগ নেই যা তিনি করেননি। তিনি সদ্য বিলুপ্ত কুষ্টিয়া কুমারখালী পৌরসভার মেয়র ও কুমারখালী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন শামসুজ্জামান অরুণ।
বিপুল বৃত্ত বৈভাবের অধিকারী অরুণের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন নির্যাতনের শিকার সাধারণ মানুষ। তার ছেলে পুত্র অর্ণব কিবরিয়া প্রতীক, তার বাবার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে, কুমারখালী পৌর শিশু পার্ক দখল করে লাখ -লাখ হাতিয়ে নিয়েছে। অর্ণব কিবরিয়া প্রতীক কুমারখালী পৌরসভার হাট – বাজারের টেন্ডারবাজি করে ।পছন্দের লোকদের দিয়ে ১৫ বছরে লাখ -লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি প্রতিবাদ করলে তাকে শারীরিক ভাবে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে।
তবে স্থানীয়রা বলছেন, সামসুজ্জামান অরুণের বিপুল সম্পদের সিকিভাগও দুদকের তদন্তে আসেনি। অরুণ কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হলেও দুদক এসব সম্পদ খুঁজে বের করতে পারেনি। তার ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এলাকায় অনেকগুলো দোকান, ঢাকায় ফ্ল্যাট ও প্লট এবং কৃষি ও অকৃষি জমির তথ্য বের করতে পারেনি দুদক। মূলত তাদের ক্ষমতার চাপে দুদক তখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি বলে অভিমত তাদের। স্থানীয়রা আরও জানান, শুধু কুমারখালী শহরেই সামসুজ্জামান অরুণের কয়েকশো কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এসব অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলার ব্যক্তি মালিকানা জমি ক্রয় বিক্রয়ের কমিশন ব্যবসা করতেন কুমারখালী পৌরসভার মেয়র শামসুজ্জামান অরুণ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এরই সূত্র ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও বিবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি। চাঁদাবাজি ভূমি দখল ও প্রতিপক্ষকে নির্যাতন নিপীড়নের ঘটনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কুমারখালী শহরে রয়েছে তার বিলাসবহুল বাড়িসহ নামে বেনামে প্রতিষ্ঠান ও জমি। অন্যের জমির পাশাপাশি সরকারি জমি দখল করে গড়ে তুলেছেন মার্কেট পরে তা বিক্রি করেছেন চড়া দামে।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকার পদত্যাগের পর থেকে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মেয়র সামছুজ্জামান অরুন। কুমারখালী কাপুড়িয়া হাটের লুঙ্গি ব্যবসায়ী বজলুর রহমান বলেন, কাপুড়িয়া হাটের দোকানের পজিশন বিক্রিতে পৌর মেয়র সামসুজ্জামান অরুণ দুর্নীতি করেছে। কেউ যদি ২ লাখ টাকা দিয়ে একটা দোকানের পজিশন নিলে তাকে দেওয়া লাগতো ১০ লাখ টাকা। আমার কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে। কিন্তু দলিল লেখা আছে অল্প টাকার। হাটের এক ইঞ্চি জায়গায় টাকা ছাড়া দেওয়া হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, তরুণ মোড় সংলগ্ন এলাকায় সরকারি জমি দখল করেছেন তিনি।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকিকুল ইসলাম, এব্যাপারে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি তবে তিনি মুঠোফোনে জানান এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত অভিযোগ আসেনি, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। সর্বশেষ ২০২১ সালের পৌর নির্বাচনে নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে তিনি ১২০ শতাংশ কৃষি জমির মালিক। তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে ২০০ শতক কৃষিজমি। এ ছাড়া যৌথ মালিকানায় ৪ তলা ১টি আবাসিক ভবনের মালিক তিনি এবং স্ত্রীর নামে ২ টা ফ্লাট দেখানো হয়েছে। নগদ ও ব্যাংকে তাঁর রয়েছে ১৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা। স্ত্রীর কাছে রয়েছে ২১ লাখ ১৬ হাজার টাকা। স্ত্রীর স্বর্ণালংকার রয়েছে ৪০ ভরি এবং ২০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র। এ বিষয়ে অভিযুক্ত সামসুজ্জামান অরুণ এর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও আত্মগোপনে থাকায় তা সম্ভব হয়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রয়েছে।
