নিজ সংবাদ ॥ গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বিদায়ে আগ মূহুর্ত পর্যন্ত কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ সহ উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রায় অধিকাংশ নেতা কর্মিরা শহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতার যাতাকলে পিষ্ট ছিলো বলে অভিযোগ উঠিয়েছেন তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা কর্মিরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৮ সালে কুষ্টিয়া সদর আসনের সাবেক এমপি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের উত্থানের সাথে সাথে ভাগ্যের চাকা দ্রুত গতিতে ঘুরতে থাকে আতাউর রহমান আতার। সাবেক এমপি হানিফের সাড়ে ৩’শ টাকার দিন মুজুর থেকে জেলা আওয়ামী লীগের প্রধাণ ত্রাণকর্তা হিসাবে উদয় হয় তার। বিশেষ করে ২০১৪ সালে মাহবুবউল আরম হানিফ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে আতাউর রহমান আতার ছিলো একক আধিপত্য। জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সকল নেতা কর্মির ভাগ্য নির্ধারন হতো আাতার সাথে সম্পর্কের উপর।
আতাউর রহমান আতার সাথে যে সকল রাজনৈতিক নেতা কর্মিদের সু-সম্পর্ক ছিলো, তাদের আর পিছন ফিরে দেখতে হয়নি। এর ঠিক বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে গত এক যুগে। আতাউর রহমান আতার সাথে সম্পর্ক খারাপের কারণে অনেক যোগ্য রাজনীতিবিদকে দলের পদ-পদবীর বাইরে রাখা হয়েছিলো। আর এই সব কাজে দরীয় বিশ^স্ত নেতা কর্মিদের সাথে আতাউর রহমান আতা তার বিশ^স্ত সাংবাদিকদেরকেও ব্যবহার করেছিলেন।
বিনিময়ে সেই সকল সাংবাদিকদের দেওয়া হতো অঢেল টাকা পয়সা। আতাউর রহমান আতার আর্শীবাদ পুষ্ট সাংবাদিক জাল সার্টিফিকেটধারী রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব ও আফরোজা আক্তার ডিউ ছিলো সেই সাংবাদিক চক্রের মূল হোতা। বিনিময়ে এই দম্পত্তি সাংবাদিক ইউনিয়ন থেকে পেয়েছেন বিপুল পরিমান অর্থ। যা প্রায় ১৮ কোটির টাকার কিছু কম বা বেশী। জাল সার্টিফিকেট দিয়ে আফরোজা আক্তার ডিউ হাতিয়ে নিয়েছেন কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুলের শিক্ষকের চাকুরী।
এছাড়াও রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব জেলা আওয়ামী লীগের পদে থাকার কারণে প্রভাব খাটিয়ে দারুল ইহসান বিশ^বিদ্যালয়ের জাল সনদ দিয়ে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ^বিদ্যালয় থেকে এমফিল শেষ করে পিএইচডিতে অধ্যায়নরত রয়েছেন। অন্যদিকে, আতাউর রহমান আতার সাথে বৈরি সম্পর্ক থাকার কারণে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজুকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছে। আতার কথা না শোনার কারণে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জকে বেশ কয়েকবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
যবলীগ এবং ছাত্রলীগের এই দুই নেতা আওয়ামী সরকারের শেষ কয়েক বছর রাজনীতিতে অনেকটাই কোনঠাসা ছিলেন। এছাড়াও সাবেক এমপি হানিফের নির্দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থীতা নির্ভর করতো আতাউর রহমান আতার উপর। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আতা-হানিফ গংকে খুশি না করলে কাউকে নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। নৌকা প্রতীক পেতে প্রত্যেক প্রার্থীকে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়েছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামেও আতা-হানিফ গং তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করতো, যা ছিলো আওয়ামী লীগের নেতা কর্মিদের মধ্যে টপ-সিক্রেট। এছাড়াও অনুষ্ঠানের নামে চাঁদা আদায় করা হতো কুষ্টিয়ার বড় বড় সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধরদের কাছ থেকে। আর সেই চাঁদার পরিমান ছিলো ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ২০-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত। আতা-হানিফের বাসার যে কোন অনুষ্ঠানের সকল ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া হতো ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের উপর। গরু থেকে শুরু করে চাল, ডাল সবকিছুর যোগানদাতা ছিলেন তারা।
আতার পেটোয়া বাহিনীর তালিকার মধ্যে সবার উপরে নাম আছে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাদ আহমেদ এর। ছাত্রলীগের ঐ কমিটির সভাপতি ইয়াছির আরাফাত তুষার পরবর্তিতে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হলেও সাদ আহমেদ কোন কমিটিতে নাম লেখাই নাই। সূত্র মোতাবেক যুবলীগের পরবর্তি কমিটিতে সাদ আহমেদকে জায়গা করে দেওয়া কথা দিয়েছিলেন আতা। সাদের তেমন কোন ব্যবসা বাণিজ্য না থাকলেও পরিবার নিয়ে দীর্ঘদিন ঢাকাতে বসবাস করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হালসা এবং পোড়াদহ এলকার মাদক সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই সাদ বিপুল পরিমান অবৈধ অর্থ রোজগার করে।
তালিকায় এর পরপরই আছে হাসিব কোরাইশী, এসকে সজিব সহ কয়েক শত ছাত্রলীগ নেতা কর্মির নাম। আর এ সকল ছাত্রলীগের নেতাদের অধিকাংশই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলো। যা বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ও অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে। সেই সাথে উঠে এসেছে আতার ছত্রছায়ার শহরকেন্দ্রিক কিশোর গ্যাংয়ের লোমহর্ষক কাহিনী। এছাড়াও কুষ্টিয়ার জেলার গণপূর্ত বিভার, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, মেডিকেল কলেজ, কুষ্টিয়া সদর হাসপাতাল সহ জেলার হাট-বাজারের সকল টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণও ছিলো হানিফের মদদপুষ্ট আতার হাতে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কুষ্টিয়া বিভন্ন দপ্তর থেকে টেন্ডার জমা দিতে না দেওয়া সহ টেন্ডার ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ছিলো স্বাভাবিক ঘটনার মতই। আর এই কাজের সার্বিক দেখভাল করতেন আতার অত্যন্ত বিশ^স্ত জহুরুল ইসলাম, সুরজিত মন্ডল ও হাসিব কোরাইশী। বিশ^স্ততার পুরস্কার হিসাবে জহুরুল ইসলামকে জেলা পরিষদের সদস্য বানিয়েছিলেন আতা। জেলা পরিষদের সদস্য হওয়ার পর জহুরুল অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জেলা পরিষদের একাধিক জায়গা নিজের নামে বরাদ্দ নিয়ে বানিয়েছেন দোকান। যার মূল্য বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী কয়েক কোটি টাকা।
সাবেক এমপি হানিফের চাচাতো ভাই হওয়ার সুবাদে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে অনেকের সাথেই ছিলো সু-সম্পর্ক। সেই সুবাদে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ হাসান মেহেদী ও আতাউর রহমান আতা বিনা টেন্ডারে হাউজিং মাঠে বাণিজ্য মেলাও করিয়েছিলেন মোটা টাকার বিনিময়ে। অথচ ক্ষমতা অপব্যবহারের এইরকম নজির কোথাও আর আছে কিনা বলা মুশকিল। আতা-হানিফের ছত্র ছায়ায় থাকা সকলের অনিয়ম ও দূর্ণীতির বিস্তারিত থাকবে পরবর্তিতে।
