নিজ সংবাদ ॥ গত বছরের এই সময়ে কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে প্রতি কেজি বাসমতী চালের কেজি ছিল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। ঠিক এক বছরের ব্যবধানে এখন সেই চাল মিলগেটে বিক্রি হচ্ছে ৮৬ টাকা কেজি। এক মাস আগেও এ চাল বিক্রি হয়েছিল ৮০ টাকায়। দর বাড়ার পাশাপাশি সব মিল বাসমতী চাল উৎপাদনও করতে পারছে না।
চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম হওয়ায় লাফিয়ে বাড়ছে দাম। তবে এবার ব্রি-ধান ৫০ জাতের আবাদ কম হয়েছে। গত বছর আবাদ ও ফলন দুটোই ছিল বেশি। বিএডিসির বীজ বিভাগ বলছে, বোরো মৌসুমে সাধারণত বাংলামতী ধানের আবাদ হয়। আর ব্রি-ধান ৫০ থেকে মূলত বাংলামতী চাল উৎপাদন হয়।
মিল মালিকরা বলেন, এই বোরো মৌসুমের শুরুতে বাসমতী ধানের মণ ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকার ওপরে। সেই ধান জুলাইয়ে এসে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯৭০ টাকা বা তারও বেশি। এ কারণে চালের দাম বেড়েছে। বাসমতী ধানের দাম বাড়ায় অন্য ধানের দামও মণপ্রতি বেড়েছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা। খাজানগর মোকামের বড় চাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দাদা রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী আরশাদ আলী বলেন, ‘গত বছর এই সময়ে বাসমতী ধানের মণ ছিল ১ হাজার ৪৫০ টাকা।
এবার সেই ধান কিনতে হচ্ছে ২ হাজার টাকা। তখন চাল বিক্রি হয়েছিল ৬৮ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে। এবার বিক্রি হচ্ছে ৮৬ টাকা। বাসমতী চাল ও ধানের দাম বাড়ার কারণ খুঁজতে কথা হয় কৃষি বিভাগ, বিএডিসির বীজ বিভাগ, কৃষক ও মিল মালিকের সঙ্গে। বিএডিসির কুষ্টিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক (বীজ বিপণন) আব্দুর রহমান বলেন, ‘সারাদেশে যে পরিমাণ ধান বোরোতে উৎপাদন হয়, এর প্রায় ১০ শতাংশ বাসমতী। একটু কমবেশি হতে পারে।
চলতি বছরের চেয়ে গত বছর বীজ বিক্রি ও আবাদ বেশি হয়েছিল। এবার বিক্রি কম হয়েছে। বিএডিসি বীজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুবায়েদ রিপন বলেন, এবার কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় সব ধানের বীজ মিলিয়ে বিক্রি হয়েছে ৪৬০ টন। এর মধ্যে ব্রি-ধান ৫০ জাত (বাংলামতী) বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৬ টন, যা মোট ধানের বীজ বিক্রির মাত্র ৬ শতাংশ। তবে গত বছর মোট বিক্রি হয়েছিল ৭১৮ টন ধান বীজ। এর মধ্যে ব্রি-ধান ৫০ জাতের বীজ বিক্রি হয়েছিল ৭৩ টন, যা মোট বিক্রির ১০ শতাংশ। সে হিসাবে এবার ব্রি-ধান ৫০ শতাংশ কম বিক্রি হয়েছে। আবাদও হয়েছে কম। সারাদেশের চিত্র একই বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বাসমতী আবাদে অন্য ধানের মতোই পানি ব্যবহার করতে হয়। এবার যেহেতু কুষ্টিয়া অঞ্চলে জিকে সেচ সরবরাহ ছিল না এবং বৃষ্টি না হওয়ায় সার্বিকভাবে সব ধানের আবাদ কিছুটা কম হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এবার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক কম জমিতে ধান আবাদ করেছেন।
ধানের দামও বাড়ছে এ কারণে। মিয়া অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী জয়নাল আবেদিন প্রধান বলেন, এবার দেশে বৃষ্টি কম ছিল বোরোতে। হাওরে মোটা ধান ছাড়া আবাদ হয় না। অনেক জেলায় পানির অভাবে ধানের ফলন ঠিকমতো হয়নি। এসব কারণে বাসমতী উৎপাদন কমে গেছে। বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এসব কারণে প্রতিদিন দাম বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বাসমতী চাল যখন একজন কৃষক ২ হাজার টাকা মণ বিক্রি করছেন, তখন অন্য কৃষকও ২৮সহ বিভিন্ন জাতের ধান বেশি দামে বিক্রি করতে চাইছেন। যেমন যে ২৮ জাতের ধান ঈদের আগেও ১ হাজার ১৮০ টাকা মণ ছিল, এখন সেই ধান কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৩৬০ টাকায়।
এভাবে বোরোতে উৎপাদিত সব ধানের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। মিল মালিকদের তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে বাসমতী চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ১৮ টাকা। আর এক মাসের ব্যবধানে সেই দাম বেড়েছে কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা। কুষ্টিয়া পৌর বাজারের চাল ব্যবসায়ী বাবু বলেন, ‘ঈদের আগে ৮২-৮৩ টাকা কেজিতে বিক্রি করছিলাম। এখন ৯০ টাকায় বিক্রি করছি। একাধিক মিল মালিক বলেন, চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকায় এই মুহূর্তে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচিত বাইরে থেকে চিকন চাল আমদানি করা।
