টেন্ডার ছাড়াই কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের পুকুর বেদখল - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

টেন্ডার ছাড়াই কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের পুকুর বেদখল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুন ২৬, ২০২৪

আমিন হাসান ॥ আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) থেকে দুই দিনব্যাপি টিকিটে মাছ ধরা চলবে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের বিশাল পুকুরে। ঢাক ঢোল পিটিয়ে বিক্রি করা হয়েছে টিকিট। প্রতি টিকিটের মূল্য ১৮ হাজার টাকা। গতকাল মঙ্গলবার (২৫ জুন) সকাল পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৩৬ টিকিট। ইতিমধ্যে বিশাল পুকুরের চারপাশে মাছ ধরার জন্য তৈরী করা হয়েছে বাঁশের মাচা। অথচ যাদের পুকুর সেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছুই জানেন না। গত ৪ বছরের উপরে কোন প্রকার টেন্ডার ছাড়াই রাজনৈতিক নেতাদের নামে পুকুরটি দখল করে রেখেছেন একটি চক্র। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পুকুরটি কারা দখল করে রেখেছেন এবং কারা মাছ চাষ করছেন তার কিছুই জানেন না। তবে পুকুর দখলকারী সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কল্লোল নামের একজন জানান, কুষ্টিয়ার এমপির নির্দেশে পুকুরে মাছ চাষ করা হচ্ছে। জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কিছু না জানিয়েই পুকুরে মাছ ধরার জন্য টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে।

উৎসব করে বিক্রি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকার টিকিট। মৎস্য শিকারিদের আকৃষ্ট করতে গত ০৯ মার্চ দুপুরে হাসপাতালের বিশাল পুকুরে বড় বড় ঢপে করে আধা কেজি ওজনের ৩৮ মণ রুই মাছের পোনা ছাড়া হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের পুকুরের চারপাশে মাছ ধরার জন্য বানানো হচ্ছে মাচা। পশ্চিম দিকে মাচা বানানো শেষ হয়ে গিয়েছে। আরো লোকজন মাচা বানানোর কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩৬ টিকিট বিক্রি হয়েছে। প্রতি টিকিটের মূল্য ১৮ হাজার টাকা। বৃহস্পতিবার বিকাল চারটা থেকে মাছ ধরা শুরু হবে। পরের দিন শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছধরা চলবে। স্থানীয়রা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় পুকুরে দুইটিতে পুরোদমে মাছ চাষ ও টিকিটের মাধ্যমে উৎসব করে মাছ ধরা হচ্ছে। সবকিছুই অবগত আছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনকি এই পুকুর দেখভালের জন্য রাখা হয়েছে নাইটগার্ড এবং পুকুরের এক কোনায় তার জন্য রুমও করা আছে। এতো কিছু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরে হতে পারে না দাবি স্থানীয়দের।

হাসপাতালের কর্মচারীরাই স্বীকার করেন, হাসপাতালের পুকুর দুটইটিতে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে মাছ ছাড়া হয়। ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে টেন্ডার বন্ধ রেখে দীর্ঘদিন চাষাবাদ করছেন। এতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছেন সরকার।

সূত্র জানায়, ২.৫৮ একর আয়তনের এই পুকুর থেকে সরকার প্রতি বছরে কমপক্ষে ৪ লক্ষ টাকা রাজস্ব পেতে পারে। যথাযথভাবে টেন্ডারের মাধ্যমে পুকুর দুইটি ইজারা দিলে প্রতিবছর এই টাকা ঘরে যেত। বিগত ৪ বছর টেন্ডার না হওয়ায় সরকার অন্তত ১৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব হারিয়েছে।

হাসপাতালের পুকুরে দায়িত্বরত নাইটগার্ড রবিউলের জানান, কল্লোল ও শাহিন নামে দুইজন হাসপাতালের পুকুর দেখভাল করতে তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। সে দীর্ঘদিন ধরে এই পুকুর পাহারা দিয়ে আসছেন। তিনি জানান, পুকুরে মাচা ও টিকিট বিক্রয় করছেন পিয়ারা তলার কল্লোল। পুকুর সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তত্ত্বাবধায়ক অথবা আরএমও কেউ কি আপনার সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ করে, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তারা কেন জিজ্ঞাসা করবে? পুকুরতো পাবলিকের কাছেই দিয়ে দিয়েছে তারা। হাসপাতালের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই।

এবিষয়ে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডাক্তার তাপস কুমার সরকারের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, হাসপাতালের পক্ষ থেকে পুকুরে কোন মাছ ছাড়া হয়নি এবং কয়েকবছর ধরে পুকুরটি কোন ইজারা দেওয়া হয়নি। পুকুরে কেউ মাছ চাষ করছে এ সম্পর্কে প্রথমে অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে বলেন, আমি এর আগে থাকা অবস্থায় একটি মিটিংয়ের মাধ্যমে টেন্ডার বন্ধ ছিল। করোনার আগের ওই মিটিং এ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বলেছিল সরকারি রাজস্বে যেহেতু হাসপাতাল কিছু পাচ্ছে না। সেজন্য টেন্ডার বন্ধ থাক। যারা আছে তারাই মাছ চাষ করুক। কিন্তু বিগত চার বছর কেটে গেলেও এখনো কেন টেন্ডার বন্ধ রয়েছে এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর সে দিতে পারেনি এই কর্মকর্তা।

এবিষয়ে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি আসার আগেই যা হওয়ার হয়েছে। আমি আসার পর আর কোন টেন্ডার হয়নি। আমরা কোন মাছ ছাড়িনি। কে মাছ ছাড়ছে সে সম্পর্কে আমার একটুও জানা নেই। আপনি আরএমমোর কাছ থেকে জানতে পারেন। আপনি না জানলে হাসপাতালের পুকুর বাইরের মানুষ কিভাবে মাছ চাষ করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা একটি কমিটি রয়েছে। এই কমিটি পুকুরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এই পুকুর থেকে কোন ধরনের অর্থ হাসপাতালে জমা হয় কি না কিংবা তারা কোন অর্থ পায় কিনা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, হাসপাতাল কোন ধরনের অর্থ পায় না। এখন যেহেতু হাসপাতাল কোন ধরনের অর্থ পায় না তাহলে হাসপাতালে পুকুর নিয়ে টিকিট বাণিজ্য চলবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এটি বন্ধের ব্যবস্থা নিচ্ছি।

হাসপাতাল পুকুরের টেন্ডারের বিষয়ে বর্তমানে পুকুরে মাছ চাষ করা যুবক কল্লোল বলেন, আপনাদের সমস্যা কি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জিঙ্গাসা করতে পারেন না। পুকুর লিজ না নিলে আমাকে কি এমনি দিয়ে রেখেছে নাকি। পুকুরে মাছ ধরার টিকিটের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি একজন এমপির নাম ধরে বলেন, তিনি টিকিট বিক্রি করার অনুমতি দিয়েছেন। কয়টা টিকিট বিক্রি হয়েছে, কত টাকায় হয়েছে তিনি বলতে পারবেন।