নতুন প্রজন্মের ভিতর দেশপ্রেম জাগ্রত করায় আমাদের মূল লক্ষ্য: ডিসি এহেতেশাম রেজা - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

নতুন প্রজন্মের ভিতর দেশপ্রেম জাগ্রত করায় আমাদের মূল লক্ষ্য: ডিসি এহেতেশাম রেজা

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুন ৩, ২০২৪

জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মুক্তিযোদ্ধার চেতনা বাস্তবায়ন প্রকল্পের আয়োজন

 

 

রঞ্জুউর রহমান ॥ নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদেরকে স্থানীয় পর্যায়ের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধকালীন বীরত্বগাথা শোনানোর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল রবিবার (২ জুন) সকাল দশটা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মুক্তিযোদ্ধার চেতনা বাস্তবায়ন প্রকল্পের আয়োজনে, প্রকল্প পরিচালক ড. মো.নুরুল আমিন এর সভাপতিত্বে, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদেরকে স্থানীয় পর্যায়ের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধকালীন বীরত্বগাথা শোনানোর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক এহেতেশাম রেজা এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন,জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজগর আলী, সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিট কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ রফিকুল আলম (টুকু),বিজ্ঞ জিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোঃ আ স ম আখতারুজ্জামান মাসুম,মানিক কুমার ঘোষ,আবদুল মোমেন,এবং জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৮ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবিলা কর, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর এ দুটো লাইন বাঙালীর হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তরপর থেকে কুষ্টিয়ার প্রতিটি গ্রামে জয়বাংলা বাহিনী গঠিত হয়। এরমধ্যে ২৫ মার্চ রাতে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের ‘ডি’ এক কোম্পানি সৈন্য এসে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন, জেলা স্কুল, থানা, আড়ুয়াপাড়াস্থ ওয়ারলেস অফিস ও টেলিগ্রাফ অফিস দখলে নিয়ে শহরে কারফিউ জারি করে। এরপর পুরো শহর দখলে নিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন জ্বালাও-পোড়াও আরম্ভ করে পাকিস্তানি বাহিনী। এদের প্রতিশোধ করতে স্থানীয় যুবক রনি রহমান সহযোদ্ধাদের নিয়ে হাতবোমা তৈরি করেন। তিনি খবর জানতে পারেন পাকিস্তানিরা নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। তাদের আক্রমণ করতে পরদিন ২৭ মার্চ নিজামতুল্লাহ সংসদের ছাদে উঠে বোমা নিয়ে তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন।  এ সময় পাকিস্তানি আর্মিরা বোমা নিক্ষেপে উদ্যত রনি রহমানকে দেখে গুলি ছোড়ে। আর্মিদের একটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধে রনিই প্রথম শহীদ হন।

তবে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুষ্টিয়ায় চরম প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ৩০ মার্চ ভোরে বাংলার দামাল ছেলেরা কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে পাকিস্তানি হানাদার ক্যাম্পে হামলা চালান। এ যুদ্ধে নিহত হয় অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা। এরপর বংশীতলা, দুর্বাচারা, আড়পাড়া, মঠবাড়িয়া, মিরপুরের কাকিলাদহ, কুমারখালীর কুশলিবাসা, করিমপুর, ঘাসখালসহ কুষ্টিয়া জেলায় ছোট বড় মিলিয়ে মোট ৪৪টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী কুষ্টিয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। সেদিন প্রথমবারের মতো মুক্ত হয় কুষ্টিয়া। পরবর্তী সময়ে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন হয়। এরপর থেকে দফায় দফায় বিমান হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তারা আবারও কুষ্টিয়া দখলে নিয়ে বাঙালি নিধন আর গণহত্যার উৎসবে মেতে ওঠে। তবে ৬ ডিসেম্বর তিন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা হানাদার মুক্ত হতে থাকে। ৯ ডিসেম্বর মধ্যে কুষ্টিয়া শহর ছাড়া অন্যান্য এলাকা শত্র“মুক্ত হয়ে যায়। তবে তুমুল যুদ্ধ চলে কুষ্টিয়ায়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সাহসী তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা  যুদ্ধ করে ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহরকে শত্র“মুক্ত করেন। ১১ ডিসেম্বর চারিদিকে কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ কুষ্টিয়া শহরে ছুটে আসেন। সেদিন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে স্লোগানে কুষ্টিয়ার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। এই দিন মুক্তিযোদ্ধারা শূন্যে রাইফেলের গুলি ফুটিয়ে উল্লাস করতে থাকে। এই সময় মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা শোনান বীর মুক্তিযোদ্ধা আ.স.ম আখতারুজ্জামান মাসুম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক কুমার ঘোষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলম টুকু ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোমেন। একাত্তর সালে সম্মুখ যুদ্ধের বর্ণনা দেন। কীভাবে গুলি করেন, গুলি খেয়ে আহত হন কীভাবে দেশ স্বাধীন করেন এসবের বর্ণনা তুলে ধরেন। মাঝে মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সে সময়ের ঘটনা সম্পর্কে জানতে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধারা বেদনাদায়ক নানান স্মৃতি রোমন্থন করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আ.স.ম আখতারুজ্জামান মাসুম বলেন একাত্তরের ২৬ মার্চ সকাল ১০টায় বীর মুক্তিযোদ্ধা রনি রহমান পেট্রোল বোমা বানিয়ে পাক বাহিনীর টহল দলের ওপর হামলা করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুম বলেন এসময় আমি তার এক কদম পিছনে ছিলাম। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোমেন যুদ্ধে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে বলেন, গুলিটা আর একটু উপরে লাগলে মারা যেতাম। পরে ভারতে চিকিৎসা নিয়েছি। ভারতের মানুষ ও সরকার সেই সময় আমাদের অনেক সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন। প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক এহেতেশাম রেজা বলেন,এই দেশ স্বাধীন করার জন্য অনেক মুক্তিযোদ্ধা নিজের জীবন বাঁজি রেখে পরিবার-পরিজনকে দূরে রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস না জানাটা অকৃতজ্ঞতার সামিল। দেশ মাতৃকাকে ভালবাসতে ও দেশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস জানা টা আবশ্যক। কারণ তোমরা একদিন এই উন্নত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। তাই তোমাদের ভেতরে দেশপ্রেম জাগ্রত করায় আমাদের মূল লক্ষ্য। দেশপ্রেম জাগ্রত না হলে দেশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা যাবে না। জেলা প্রশাসক আহ্বান করেন  দেশপ্রেমকে ধারণ করে তোমাদের উপর যে অর্পিত দায়িত্ব রয়েছে তা তোমরা সঠিকভাবে পালন করবে। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রায় ৬০ জন অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিজয়ী হয়েছে ১০ জন। বিজয়ীদের মধ্যে ৩ জন কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী, ৩ জন কুষ্টিয়া কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী, ২ জন কুষ্টিয়া কলকাকলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ১ জন কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও একজন কুত্তয়াতুল কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ মোট ১০ জন  শিক্ষার্থীকে পুরস্কার ও সনদ প্রদান করা হয়।