ভস্ম থেকে জেগে ওঠার লড়াই - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ভস্ম থেকে জেগে ওঠার লড়াই

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ৩০, ২০২৪

নিজ সংবাদ ॥ আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ থেকে নিজেদের বই-খাতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী খাদিজা ও তার ভাইবোনরা। কিন্তু পড়ার মতো বই অবশিষ্ট নেই। মোটামুটি পড়ার মতো এমন এক-দুটি বই ছাড়া অন্য কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি চার ভাইবোন। এই চিত্র কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর বসোয়া পশ্চিমপাড়ার। পান চাষি আল আমীন ইন্তাজের সন্তান খাদিজা, সাদিয়া, মারিয়া ও ইয়ামিন। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পানের বরজ থেকে সৃষ্ট আগুনে তাদের ঘরসহ চারটি বসতঘর পুড়ে যায়। শুধু বইপত্র নয়, ঘরের অন্য জিনিসপত্র ও ফসলও পুড়ে ছাই হয়েছে আগুনে। সর্বস্ব হারিয়ে চার কৃষক পরিবারের সদস্যরা দিশেহারা। পোড়া ঘরের ভিটায় সিমেন্টের বস্তা টাঙিয়ে রাত পার করছে তিনটি পরিবার। অন্য একটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে বাবার বাড়ির রান্নাঘরে। পোড়া ভিটায় কবে ঘর উঠবে, তা জানেন না তাদের কেউ। এ ঘটনায় আরও ছয় কৃষকের প্রায় ৫ বিঘার পানের বরজ পুড়ে গেছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে ইসাহক আলীর পানের বরজে আগুন লাগে। তাপদাহের প্রভাবে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভস্মে পরিণত হয় প্রান্তিক কৃষক ও ঘোড়ার গাড়ির চালক আল আমীন ইন্তাজ, তাঁর ভাইয়ের ছেলে মাসুদ মন্ডল, সবুজ হোসেন মন্ডল ও সাবু মন্ডলের বাড়িঘর। গত রোববার সকালে বসোয়া পশ্চিমপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ১২টি ঘরের ভিটায় শুধু কংক্রিটের খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পানিশূন্য বসোয়া খাল। সেই খালের পাড়ে পুড়ে যাওয়া ঢেউটিনগুলো স্তুপ করে রাখা। ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে পুড়ে যাওয়া ঘরের ভেতর থেকে বই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে খাদিজা। গাছের ছায়ায় দল বেঁধে বসে পুড়ে যাওয়া পেঁয়াজ বাছাই করছিলেন কয়েকজন নারী ও পুরুষ।  খাদিজা জানায়, অগ্নিকান্ডের সময় বাড়ির পাশেই নিজেদের পানের বরজে পান গাছের মাথা মুড়ার কাজ করছিল সে। হঠাৎ মাঠের কৃষকদের চিৎকারে বেরিয়ে এসে দেখে, কৃষক ইসাহকের বরজে আগুন জ্বলছে। দেখতে দেখতে তার এক চাচাতো ভাইয়ের ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সেও আগুন নেভাতে ব্যস্ত হয়ে যায়। নিজেদের ঘরসহ স্বজনের ১২টি ঘর পুড়ে যেতে দেখেছে। তাদের চার ভাইবোনের বই-খাতা, শখের পোশাক সব শেষ। দুপুরের খাবার তৈরি ছিল, কিছুই রক্ষা করা যায়নি। খাদিজার ভাষ্য, আগুন লাগার পর পরিবারের সদস্যরা অনেকবার খোকসার ফায়ার সার্ভিসে ফোন করেছিলেন। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসার আগেই সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিষণ্ন মনে খাদিজা জানায়, সে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বই পেতে সময় লাগবে। আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের ভেতর থেকে বড় বোন সাদিয়ার দু-একটি গাইড বই উদ্ধার করতে পেরেছে। কিন্তু তার নিজেরসহ তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোন মারিয়া ও ছোট ভাই ইয়ামিনের একটি বইও উদ্ধার করতে পারেনি। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মাসুদ মন্ডল তাঁর স্ত্রী রিক্তা খাতুন ও চার সন্তান নিয়ে বাবা আব্দুল লতিফের বাড়ির রান্নাঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। কংক্রিটের খুঁটি ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই মাসুদ মন্ডলের। তাদের ঘরে প্রায় ১৫০ মণ পেঁয়াজ, ধান, গম, ডাল ও বীজ ছিল। সব পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত রিক্তা খাতুন কবে নিজেদের ভিটায় ফিরতে পারবেন তা জানেন না। অগ্নিকান্ডের দিন তাঁর স্বামী ও দেবর-ভাশুররা বাড়িতে ছিলেন না। কয়েকদিন আগে তারা গ্রামের অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে অন্য জেলায় ধান কাটার কাজে গিয়েছিলেন। আল আমীন ইন্তাজও ঘটনার দিন বাইরে ছিলেন। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে অনেক দেরি করে। ফলে সন্তানদের পড়ার বই, পোশাক, সংসারের জিনিসপত্র কিছুই রক্ষা করেতে পারেননি। এ বিষয়ে খোকসা ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। তাই সেখানে পৌঁছতে দেরি হয়। আগুনে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহযোগিতা পাননি জানিয়ে আল আমীন ইন্তাজ বলেন, গ্রামের মানুষ এগিয়ে না এলে আমাদের না খেয়ে মরতে হতো। এ বিষয়ে শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল কুদ্দুস বলেন, কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাদের সহযোগিতায় গ্রামের মানুষ এগিয়ে এসেছে। সরকারি সহায়তার জন্য কাগজপত্র তৈরি করা হচ্ছে। ইউএনওর দপ্তরে তা পাঠানো হবে।