কুষ্টিয়ার ৪টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের মহাউৎসব - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার ৪টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের মহাউৎসব

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: ডিসেম্বর ২৭, ২০২৩

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়ার ৪টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গের মহাউৎসব চলছে। প্রতিটা আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী, সমর্থক ও কর্মিদের সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মি সমর্থকদের চলছে নানা রেশারেশি এবং পাল্টাপাল্টি গরম বক্তব্য। নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গের কারণে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কমিটি ইতিমধ্যে শোকজ করেছেন একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের।

কুষ্টিয়ার ৪টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের মহাউৎসব

কুষ্টিয়ার ৪টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের মহাউৎসব

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য আ. কা. ম সরওয়ার জাহান বাদশাহর বিরুদ্ধে নৌকা প্রতীকে ভোট না দিলে ভোটারদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (২৫ ডিসেম্বর) রাতে দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নে নির্বাচনী পথসভায় তিনি এ হুমকি দেন। তার ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বাদশাহ দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বাদশাহ বলেন, ‘আমি কে, আপনারা জানেন এবং চেনেন। আমি বেশী কথা বলবো না। এখানে যারা আছেন, ভোট আমাকে দিতে হবে, পরিষ্কার কথা। নৌকা মার্কায় আমাকে ভোট দিতে হবে। এই অধিকার আমার আছে। সুতরাং যার মনে যাই থাকুক না কেন, যতই নাচানাচি-গুতাগুতি করেন না কেন, মনস্থির করেন, নৌকা মার্কায় বাদশাহকে ভোট দিতে হবে। উল্টাপাল্টা দু-একজন বকছে, সোজা করে দেব কিন্তু। এরপরে উল্টাপাল্টা কথা যদি শুনি সোজা করে দেব। মনে রাইখেন।’

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য আ ক ম সরওয়ার জাহান বাদশাহর বিরুদ্ধে নৌকা প্রতীকে ভোট না দিলে ভোটারদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও দৌলতপুর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী নাজমুল হুদা পটলের পোস্টার ছিড়ে ফেলে কর্মী সমর্থকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিলো।

অন্যদিকে কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর ভেড়ামারা) আসনে রবিবার (২৪ ডিসেম্ব) দুপুরে মিরপুর উপজেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ আলী দলীয় কার্যালয়ের সামনেই হেনস্থার শিকার হন কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সহ-সভাপতি বাহাদুর শেখ’র হাতে। বিষয়টি প্রথমে চাপা থাকলেও এ সোমবার (২৫ ডিসেম্বর) এ ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বাহাদুর শেখ মিরপুর উপজেলা জাসদের কার্যালয়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের সামনেই আহাম্মদ আলী সঙ্গে কথা বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পরে তিনি আহাম্মদ আলীকে চেয়ার তুলে মারতে উদ্যত হন। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে নিবৃত্ত করেন। প্রথমে বিষয়টি চাপা থাকলেও গতকাল তা সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর বিষয়টি টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়। এছাড়াও নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দায়ে এই আসনের একাধিক নেতাকে শোকজ করে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কমিটি।

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) কুষ্টিয়ায় হানিফের নির্বাচনী সভায় নারী ভোটার ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উদ্দেশ্য করে হুমকি দিয়ে অশালীন ভাষায় বক্তব্যে দিয়েছেন এক কাউন্সিলর। এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেটি পেজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রকাশ্যে সভায় এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের সামনেই প্রকাশ্যে নৌকায় সীল মারার নির্দেশ দিলেন কুষ্টিয়া পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ কৌশিক আহমেদ ওরফে বিচ্ছু। না হলে পিটিয়ে….. (অশ্রাব্য শব্দ) চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। তার এ ধরণের বক্তব্যের একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার রাতে কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া দিণমনি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী মাহবুবউল আলম হানিফের এক নির্বাচনী সভায় এ বক্তব্য দেন বিচ্ছু। প্রায় ৫মিনিটের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

অবশ্য কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করার কারণে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদ ও বর্তমান সংসদ সদস্য মাহাবুবউল আলম হানিফ, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা এবং পারভেজ আনোয়ার তণুকে শোকজ করে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কমিটি। এদিকে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডে (জিকে বালুর ঘাটের পাশে) স্বতন্ত্র প্রার্থী পারভেজ আনোয়র তনুর “ঈগল” প্রতীকের নির্বাচনী ক্যাম্প পরিচালনা হচ্ছিল। সোমবার (২৫ ডিসেম্বর) আনুমানিক দুপুর দেড়টার সময় স্থানীয় (পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড) তৈমুর বান্দা পালং, আসিফ বান্দা পুলকসহ ১০/১২ জন সন্ত্রাসী নির্বাচনী ক্যাম্প ইনচার্জ শহর শ্রমিক লীগের সভাপতি দেওয়ান মাসুদুর রহমান স্বপনের উপরে অতর্কিত হামলা ও ক্যাম্প ভাংচুর করা হয় বলে জানা যায়। ঐ একই দিনে সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ঈগলের নির্বাচনী ক্যাম্প ভেঙে সেখানে নৌকার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সোহেল রানা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় মো. শামীম শেখ নামের স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক কর্মী নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। এছাড়াও মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঝাউদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ঝাউদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কেরামত আলী বিশ^াস ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং ইউনিয়ন পরিষেদের চেয়ারম্যান মেহদেী হাসানের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীকে তুলে নিয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ উঠে। জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরে ঝাউদিয়া ইউনিয়নের হাতিয়া বাজার থেকে ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী পারভেজ আনোয়ার তনুর সমর্থক সাগরকে মারধর করে। এছাড়াও আরো দুই জনকে মারধর করা নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কুষ্টিয়া-৪ ( কুমারখালী ও খোকসা) আসনে নির্বাচনী আচরণ বিধি সবথেকে বেশী লঙ্ঘিত হয়েছে। নৌকার প্রার্থী সেলিম আলতাফ জর্জ সমর্থক ও কর্মীরা বিধি উপেক্ষা করে নির্বাচনী কার্যলয়ে অগ্নিসংযোগ, নির্বাচনী পথ সভায় হামলা সহ পোষ্টার ছেড়ার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার (২৩ ডিসেম্বর) সন্ধা আনুমানিক ৭টা দিকে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার জানিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মজিবর রহমান মজিদ এর নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জনের লাঠিয়াল বাহিনী রাম দা সহ একতারপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুর রউফ’র ট্রাক মার্কা প্রতীকের নির্বাচনী অফিসে হামলা করে ভাংচুরের অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, সন্ধা আনুমানিক ৭টার দিকে জানিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মজিবর রহমান মজিদ এর নেতৃত্বে জানিপুর ইউনিয়নের বিহারিয়া এলাকার মৃত ওয়াহেদ মোল্লার ছেলে শরিফুল ইসলাম (৪৫), আমীর সরদারের পুত্র আকাশ (২৫), মৃত সামসুদ্দিন সরদারের পুত্র সোনাই সরদার (৪৫), বনগ্রাম এলাকার মাহাতাব মন্ডলের ছেলে মাছুদ মন্ডল (৪০), মৃত তৈয়ব বিশ^াসের ছেলে আবু ওবায়দা শফি (৪৫), বলাই মন্ডলের ছেলে ধনি মন্ডল (৩৪) এবং বহরমপুর এলাকার নুরুল বিশ^াসের ছেলে খায়রুল (৩৫), মোয়াজ্জেমের ছেলে রাসেল বিশ^াস (৪০), নজির মোল্লার ছেলে লুলু মোল্লা (৩৫), ইউনুস বিশ^াসের ছেলে রাকিবুল হাসান শাওন (৩৫) সহ আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ জনের লাঠিয়াল বাহিনী রাম দা সহ আবদুর রউফ’র ট্রাক মার্কা প্রতীকের নির্বাচনী অফিসে সন্ত্রাসী হামলা চালায় এবং অফিসের চেয়ারসহ অনান্য আসবাব সামগ্রী ভাংচুর করে। সেই সাথে অফিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায়।

শনিবার (২৩ ডিসেম্বর) বিকেলে কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের উত্তর মিরপুর আদর্শ গ্রামে উঠান বৈঠকে নৌকার প্রার্থীকে ভোট না দিলে সুবিধাভোগীদের ভাতা সহ সকল সুযোগ সুবিধা বন্ধের হুমকি দেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও চাপড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক মনজু। উঠান বৈঠকে বক্তব্য প্রদান কালে তিনি বলেন, আপনাদের পাশে কিন্তু আমরাই ছিলাম। ১০টাকা কেজির চাল, টিসিবির পণ্য এই গুলো পাইনা কে কে হাত তোলো। সর্বোচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত ফ্রি দেওয়া হচ্ছে। এগুলো কে দিচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নৌকা মার্কায় যদি আপনারা ভোট না দেন, যেগুলো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন, সব বাতিল হয়ে যাবে। অন্য কোন ক্যান্ডিডেট ট্রাক মার্কা বলেন, বটগাছ বলেন, তালগাছ বলেন, এরা যদি এসে ভোট চায় আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না। কারণ প্রধানমন্ত্রী নৌকা প্রতীকটা পাঠাইছে কুমারখালী-খোকসায় একজনকে। সে হচ্ছে সেলিম আলতাফ জর্জ। আমরা যার জন্য এসেছি। এ প্রতীক বাদে অন্য কোন প্রতীকে, ট্রাক মার্কা বা যে কোন গাছে টাছে ভোট দিলে সব উন্নয়ন কিন্তু বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়াও গত রোববার (২৪ ডিসেম্বর) দুপুরে কুমারখালী পৌরসভার কাজীপাড়া রেলগেট এলাকায় ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) মনোনিত প্রার্থী মো. শহিদুল ইসলামকে (আম মার্কা) একটি দোকানঘরে প্রায় ৩০ মিনিট আটকে রেখে প্রার্থীর কাছে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ সিয়ামের বিরুদ্ধে।

সোমবার (২৫ ডিসেম্বর) ভোর রাতে কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর বেলতলা এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর কার্যলয়ে অগ্নিসংযোগ এবং গত রোববার রাতে কুমারখালী স্টেশন বাজার এলাকায় নৌকা ও ট্রাকের প্রতীক ছেড়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সোমবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুরে এবং গত রোববার বিকেলে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নিকট চারটি লিখিত অভিযোগ করেছেন প্রার্থী ও সমর্থকরা। এছাড়াও ইতিমধ্যে নির্বাচনী সহিংসতার কারণে কুমরাখালী থানায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং কুমারখালী ও খোকসা থানায় একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৭ জানুয়ারী ২০২৪ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।