খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৪৯ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় অবস্থিত কুষ্টিয়া জেলা কেবল ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্যই পরিচিত নয়, বরং এর অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং মানুষের পেশাগত কাঠামো অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। উর্বর পলিমাটি, নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি, এবং ভৌগোলিক সুবিধার কারণে কুষ্টিয়ার গ্রামীণ ও শহুরে জনগোষ্ঠীর পেশার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে কৃষি থেকে শুরু করে কুটিরশিল্প, বৃহৎ ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবামূলক খাতে। সময়ের বিবর্তনে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই জেলার মানুষের কর্মসংস্থানের ধরনেও এসেছে বহুমুখী পরিবর্তন।
কুষ্টিয়ার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। গড়াই ও পদ্মা নদীর অববাহিকার উর্বর পলিমাটি এই অঞ্চলে বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
কৃষি খাতের একটি প্রধান অংশজুড়ে রয়েছে ধান চাষ। আমন, বোরো ও আউশ ধান উৎপাদনে কুষ্টিয়ার কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি, ঐতিহাসিক কাল থেকেই এই অঞ্চলে পাট চাষের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। এছাড়া গম, ভুট্টা, মসুর ডাল এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির মতো রবি ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকরা সারা বছর নিজেদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেন।
কুষ্টিয়া জেলায় বাণিজ্যিকভাবে তামাক চাষের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। যদিও তামাক চাষের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এই অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট অংশের কৃষক ও শ্রমিকরা তামাক চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল। এছাড়া পান, কলা এবং আমের বাগান কুষ্টিয়ার কৃষিজীবীদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
কুষ্টিয়া জেলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে হস্তশিল্পের ভূমিকা অনন্য। বিশেষ করে তাঁতশিল্প এই অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবিকার প্রধান মাধ্যম।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা এবং এর আশপাশের এলাকাবাসী যুগ যুগ ধরে তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এখানকার তৈরি শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা এবং চাদর দেশজুড়ে সমাদৃত। তাঁত মালিক, কারিগর, সুতা ব্যবসায়ী এবং ডাইং শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের নিবিড় পরিশ্রমে এই কুটিরশিল্প একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাতে রূপ নিয়েছে। গ্রামীণ নারীরাও এই শিল্পের সুতা পরিচর্যা ও সূচিকর্মের সঙ্গে যুক্ত থেকে পারিবারিক আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের প্রসারে মৃৎশিল্প কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী কুমার সম্প্রদায় এখনও মাটির তৈরি রান্নার পাত্র, শৌখিন জিনিসপত্র ও পূজার সামগ্রী তৈরির পেশা ধরে রেখেছেন। একইভাবে, বাঁশ ও বেতের তৈরি কুলা, চালুন, মোড়া এবং টুকরি তৈরির সঙ্গে জড়িত কারিগররা গ্রামীণ অর্থনীতির একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অপরিহার্য অংশ।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা, পোড়াদহ, ভেড়ামারা এবং মিরপুর অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাব বা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
কুষ্টিয়া জেলাকে বলা হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চালের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র। এখানে শত শত অটোমেটিক ও হাসকিং রাইস মিল গড়ে উঠেছে। এই মিলগুলোতে ধান সংগ্রহ, চাল ছাঁটাই, বস্তাবন্দী করা এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিক, চাল ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং প্রকৌশলী যুক্ত রয়েছেন। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের এই ব্যাপক প্রসারের ফলে কুষ্টিয়ার শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শহর ও উপশহর কেন্দ্রিক ব্যবসা কুষ্টিয়ার অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে। বড়বাজার, এনএস রোড এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক এলাকার ব্যবসায়ীরা বস্ত্র, হার্ডওয়্যার, ইলেকট্রনিক্স, সার ও কীটনাশক এবং কৃষিপণ্যের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের এই অংশগ্রহণ স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
গত কয়েক দশকে কুষ্টিয়া জেলায় শিক্ষার হার এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উন্নয়নের ফলে চাকরিজীবী শ্রেণির মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কুষ্টিয়া কালেক্টরেট, উপজেলা পরিষদ, বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা এবং সরকারি দপ্তরে হাজার হাজার মানুষ চাকরি করেন। এছাড়া বেসরকারি এনজিও, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবীরা কুষ্টিয়ার মধ্যবিত্ত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ এবং অসংখ্য স্কুল-কলেজের শিক্ষক, গবেষক এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীরা এই জেলায় একটি সম্মানজনক বুদ্ধিবৃত্তিক পেশাজীবী সমাজ তৈরি করেছেন। শিক্ষা খাতকে কেন্দ্র করে বইয়ের ব্যবসা, কোচিং সেন্টার এবং ছাত্রাবাস পরিচালনাও অনেকের জীবিকার উৎস।
নদী ও খালের প্রাচুর্যের কারণে কুষ্টিয়ার একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী মৎস্য শিকার ও মাছ চাষের পেশার সঙ্গে যুক্ত। গড়াই নদী ও এর সংলগ্ন জলাশয় থেকে মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা অনেক জেলের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। পাশাপাশি, আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবাদিপশু পালন (গরু ও ছাগল খামার) এবং পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে তোলার প্রবণতা কুষ্টিয়ায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনের এই খামারগুলো তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
আধুনিক যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে কুষ্টিয়ার পেশাগত কাঠামোতে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের একটি বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কুষ্টিয়ার তরুণ ও যুবসমাজ পাড়ি জমাচ্ছেন। বিদেশ থেকে প্রেরিত রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয় এই অঞ্চলের গ্রামীণ ও শহুরে পরিবারের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনে এবং আবাসন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
| পেশার খাত | প্রধান কার্যক্রম | কর্মসংস্থানের পরিধি | অর্থনৈতিক প্রভাব |
| কৃষি ও চাষাবাদ | ধান, পাট, তামাক ও রবি ফসল উৎপাদন | বৃহৎ গ্রামীণ জনবহুল অংশ | খাদ্য নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ জোগান |
| তাঁত ও কুটিরশিল্প | শাড়ি, লুঙ্গি ও হস্তশিল্প প্রস্তুত | কুমারখালী ও গ্রামীণ অঞ্চল | কুটিরশিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রাখা |
| চালকল ও শিল্প | চাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ | কুষ্টিয়া সদর, পোড়াদহ ও ভেড়ামারা | আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ |
| চাকরি ও সেবা | শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যাংক ও বেসরকারি চাকরি | শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত সমাজ | প্রাতিষ্ঠানিক আয় ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন |
| প্রবাস আয় | আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান | যুব ও তরুণ সমাজ | বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আর্থিক সচ্ছলতা |
কুষ্টিয়া জেলার মানুষের প্রধান পেশা হলো কৃষিকাজ। তবে এর পাশাপাশি তাঁতশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চাকরিও অন্যতম প্রধান জীবিকা।
কুমারখালীর তাঁতশিল্প কুষ্টিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেখানে হাজার হাজার তাঁতি ও কারিগর লুঙ্গি, শাড়ি ও গামছা তৈরির সঙ্গে যুক্ত।
কুষ্টিয়া জেলা মূলত চালকল (রাইস মিল) শিল্প এবং তাঁতশিল্পের জন্য দেশজুড়ে বিশেষভাবে পরিচিত।
এই এলাকাগুলো প্রধানত পাইকারি ব্যবসা, ধান ও চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ মিল এবং পরিবহন খাতের ওপর নির্ভরশীল।
কুষ্টিয়ায় ধান ও পাটের পাশাপাশি তামাক, কলা এবং বিভিন্ন রবি ফসল অর্থকরী ফসল হিসেবে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয়।
কুষ্টিয়া জেলায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ এবং কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা শিক্ষা খাতে পেশাগত সুযোগ তৈরি করেছে।
কৃষি ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পের পাশাপাশি কুষ্টিয়ার তরুণ সমাজ প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি, ব্যবসা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের (রেমিট্যান্স) দিকে বেশি ঝুঁকছে।
মন্তব্য