বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কুষ্টিয়া জেলা শুধু ভৌগোলিক গুরুত্বেই নয়, বরং এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দর্শনীয় স্থান, এবং বিখ্যাত খাবারের জন্যও সুপরিচিত। একে অনেকেই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলে থাকেন।

রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ী – কুষ্টিয়া জেলা
🎓 শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার গৌরব – ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), কুষ্টিয়া জেলার অন্যতম গর্ব। এখানে ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামী আইন ছাড়াও বিজ্ঞান, প্রকৌশল, ব্যবসা প্রশাসন, সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক অনুষদে পাঠদান হয়। বর্তমানে ৮টি অনুষদের অধীনে ৩৬টি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।

গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন
🎭 সংস্কৃতি ও শিল্পকলার কেন্দ্র
কুষ্টিয়াকে সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে খ্যাতির পেছনে রয়েছে—
- বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দ্বিতীয় বৃহত্তম শাখা
- লালন সাঁইজীর আখড়া—দর্শন ও মানবতাবাদী বাউল চর্চার কেন্দ্র
- পুতুলনাট্যের সূচনা ক্ষেত্র—সেলিম আল দীন ও অন্যান্য নাট্যজনদের কর্মক্ষেত্র

ফকির লালন সাঁইজির মাজার -কুষ্টিয়া জেলা
🏭 শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড
কুষ্টিয়া শহর, কুমারখালী এবং ভেড়ামারা পৌরসভায় বিসিক শিল্প নগরী গড়ে উঠেছে, যেখানে রয়েছে টেক্সটাইল, খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ, ও ক্ষুদ্র কারখানা। এখানকার চিনিকল, তামাক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, এবং বেভারেজ কারখানা জাতীয় শিল্পে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
👤 কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব
কুষ্টিয়া জন্ম দিয়েছে বহু গুণী মানুষকে, যাঁরা দেশ ও বিশ্বে কীর্তি স্থাপন করেছেন:
- ফকির লালন সাঁইজী – দর্শন ও বাউল সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ
- মীর মশাররফ হোসেন – বাংলা গদ্য সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচয়িতা, “বিষাদসিন্ধু”র লেখক
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – শিলাইদহে কুঠিবাড়িতে তাঁর সাহিত্যকর্মের উল্লেখযোগ্য অংশ রচিত হয়েছে
- সেলিম আল দীন – নাট্যকার, গবেষক, নাট্যশিল্পে পুতুলনাট্যের উদ্ভাবক
- এম এ ওয়াদুদ – ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক
- আবদুল গফফার চৌধুরী – “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” গানের রচয়িতা
🏞️ বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানসমূহ
কুষ্টিয়া জেলা পর্যটকদের জন্য অপার সৌন্দর্যের আধার:
- লালন শাহের মাজার ও আখড়া (ছেউড়িয়া) – বাউল সাধক লালন সাঁইজীর চিরনিবাস
- শিলাইদহ কুঠিবাড়ি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য জমিদারবাড়ি
- চাপড়া ব্রীজ ও গড়াই নদী – নদীবন্দর ও দর্শনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ
- কুমারখালী প্রেস ও পত্রিকা ভবন – বাংলা সংবাদপত্র ইতিহাসের অংশ
- হেমায়েতপুর মাদ্রাসা ও মসজিদ – ধর্মীয় ঐতিহ্যের নিদর্শন
- কুষ্টিয়া জাদুঘর – জেলার ঐতিহাসিক নিদর্শন ও সাংস্কৃতিক সংগ্রহশালা
🍽️ কুষ্টিয়ার বিখ্যাত খাবার
কুষ্টিয়ার স্থানীয় খাবার ও মিষ্টান্ন জিভে জল আনে:
- ছেউড়িয়ার মিষ্টি – বিশেষ করে ছানার সন্দেশ
- গরুর মাংস ভুনা ও খিচুড়ি – স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়
- কুমারখালীর গুড় ও তালের পিঠা
- তামাক পাতার তৈরি স্থানীয় চিবানো পণ্য
- খেজুর রস ও গুড় – শীতকালের উপাদেয় খাবার
🕌 ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য
- লালন দর্শনের মূল কেন্দ্র – মানবধর্ম ও সাম্যবাদে বিশ্বাসী আধ্যাত্মিক দর্শন
- মাজার ও পীর আখড়া – ইসলামি সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র
- বহু পুরাতন মন্দির ও মসজিদ – বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতির নিদর্শন
কুষ্টিয়া জেলা একাধারে শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, ইতিহাস ও আত্মার নিঃশব্দ সুরের প্রতীক। এই জেলার প্রত্যেকটি প্রান্তজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ঐতিহ্য আর কীর্তির বিচিত্র উপাখ্যান। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র, বাউল সাধক লালন ফকিরের দর্শনের শিকড়, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচর্চার নীরব কুঠিবাড়ি, আর কর্মঠ মানুষের শিল্পকেন্দ্র—সব মিলিয়ে কুষ্টিয়া এক অনন্য গর্ব ও ভালোবাসার নাম।