কুষ্টিয়ার উদিবাড়িতে স্ত্রীর সম্পত্তি জাল দলিলে আত্মসাতের অভিযোগ
কুষ্টিয়া শহরতলীর ১৮ নং ওয়ার্ড উদিবাড়িতে স্ত্রীর সম্পত্তি প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে স্বামী আবু হানিফের বিরুদ্ধে। সম্পত্তির লোভে স্ত্রীকে ভূয়া তালাক দিয়ে স্ত্রীর অধিকার থেকে বঞ্চিত করারও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী কহিনুর বেগম। এই ঘটনায় কুষ্টিয়ার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে ৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারায় আবু হানিফকে ১ নং আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেছেন করেছেন। মামলা নং- ৮৯২/২০২৩। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন-পিবিআইকে তদন্তের আদেশ দিয়েছেন।

কুষ্টিয়ার উদিবাড়িতে স্ত্রীর সম্পত্তি জাল দলিলে আত্মসাতের অভিযোগ
মামলায় আবু হানিফ ছাড়াও তার সহযোগী হিসেবে শহিদুল ইসলাম, জিয়াউর রহমান উভয় পিতা- মৃত মনির হোসেন, হামিদা খাতুন, পিতা- আবু হানিফ, উভয় সাং- উদিবাড়ী, কুষ্টিয়া পৌরসভা ১৮ নং ওয়ার্ড, কুষ্টিয়া সদর কুষ্টিয়া ছাড়াও ভূয়া দলিল তৈরীর অভিযোগে কুষ্টিয়া সদর সাব রেজিষ্ট্রী অফিসের দলিল লেখক আব্দুল জলিলকেও আসামী করা হয়েছে।
মামলার আরজীতে বাদী কহিনুর বেগম অভিযোগ করেছেন, ১ নং আসামী সাথে বাদীর স্বামী। প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় বাদীকে বিবাহ করেন। ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে বাদীর গর্ভে ৪ মেয়ের জন্ম হয়। ২০০৯ সালে বাদী তার পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রির টাকা দিয়ে এস ২৫ নং বাড়াদী মৌজায় আর এস রেকর্ডীয় মালিক আবুল কাশেম ও হবিবর রহমানের নিকট থেকে ৪৮ শতক জমি ক্রয় করেন। জমি ক্রয়ের পর সহকারী কমিশনার কুষ্টিয়া সদর ভূমি অফিস থেকে বাদীর নিজ নামে নামপত্তন করেন। যার খারিজ কেস নং- ৪৯০০/৯-১/২০১০-২০১২ ও খারিজ খতিয়ান নং- ১৯৭২।
বাদীর নামে থাকা সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ১ নং আসামী গত ২০২২ সালের ২৩ আগষ্ট তালাক দেন। তালাকের পর বাদী তার মেয়েদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ১ নং আসামী শুধু বাদীর সাথেই নয় তার ৪ মেয়েকেও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন। স্ত্রীর নামে থাকা সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২১ মার্চ কুষ্টিয়া সদর সাব রেজিষ্ট্রী অফিসে ২৮১৭ নং জাল দলিলের মাধ্যমে বাদীর নামে থাকা ৪৮ শতক সম্পত্তি বাদীর নামে জাল রেজিষ্ট্রী দলিলের মাধ্যমে বাদীকে না জানিয়ে বাদির স্থলে অন্য মহিলাকে সাজিয়ে আত্মসাৎ করেন। এই জাল দলিল তৈরীতে সহযোগিতা করেন ১নং আসামী আবু হানিফের ভাই মৃত মনির হোসেনের দুই ছেলে শহিদুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমান, আবু হানিফের ১ম স্ত্রীর মেয়ে হামিদা খাতুন ও কুষ্টিয়া সদর সাব রেজিষ্ট্রী অফিসের দলিল লেখক আব্দুল জলিল।
এই প্রতিবেদকের হাতে আসা মামলার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০৯ সালের ২৪ মে বাদী কহিনুর বেগম তার পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে ৩৫১১ খোষ কবলা দলিলে আবুল কাশেম ও হবিবর রহমানের কাছে থেকে জমিটি ক্রয় করে তার নিজের নামে রেজিষ্ট্রি করেন। বাদীর ক্রয়কৃত জমিটি ২০২৩ সালের ২১ মার্চ ২৮১৭ জাল দলিলে আবু হানিফ তার নিজ নামে রেজিষ্টি করেছেন। অথচ আবু হানিফ ২০২২ সালের ২৩ আগষ্ট তার স্ত্রী কহিনুর বেগমকে তালাক প্রদান করেন। তালাক প্রদান করার কহিনুর বেগম নিজেই সংসার চালাতে পারছেন না, তাহলে তালাক দেওয়া স্বামীকে তার নিজের নামে থাকা সম্পত্তি কেন প্রদান করবেন?
ভুক্তভোগী কহিনুর বেগমের দাবি আবু হানিফের সাথে দীর্ঘ ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে তার নিজের ৪ মেয়েকে মানুষ করার পাশাপাশি তার আগের স্ত্রীর ৫ ছেলে মেয়েকে পড়ালেখা থেকে শুরু করে তাদের দেখভালের সব দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। শেষ বয়সে এসে তার স্বামী আবু হানিফ তার সাথে এমন প্রতারণা করবে ভাবতে পারিনি। তিনি বলেন, আমার নিজের ৩ মেয়েকে বিয়ে দিলেও এখন ১টা মেয়ে ঘরে আছে। তার বিয়ে দিতে হবে। এদিকে ভাড়া বাসায় নিজের সংসার চালানোর মত অবস্থা নাই।

মামলার বাদি কহিনুর বেগম দাবি করছেন, আমার ধারনা আবু হানিফ তার প্রথম স্ত্রীর মেয়ে হামিদা খাতুনকে আমার নাম পরিচয় ব্যবহার করিয়ে জাল দলিল তৈরী করেছে। জাল দলিলে যে টিপসই দেওয়া হয়েছে সেই টিপসই আমার না, আমার ধারণা হামিদা খাতুনের টিপসইয়ের সাথে জাল দলিলের টিপসই তদন্ত সংস্থা পিবিআই যদি মিলিয়ে দেখে তবে মিলে যাবে। আমি কখনও রেজিষ্ট্রি অফিসে গিয়ে আবু হানিফকে জমি রেজিষ্ট্রি করে দেইনি। এই দলিল তৈরীতে কুষ্টিয়া সদর সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আব্দুল জলিল জড়িত রয়েছে। তাকে তদন্ত কর্মকর্তা হেফাজতে নিয়ে জিঙ্গাসাবাদ করলে আমার দাবির সতত্যা মিলবে।
কহিনুর বেগমের ছোট মেয়ে মীম এই প্রতিবেদককে জানান, আমার বাবা আবু হানিফ আমাদের এভাবে পথে নামিয়ে দিবে কোন দিন ভাবি নি। এক বেলা খেয়ে না খেয়ে মাকে অসুস্থ মাকে নিয়ে ভাড়া বাসায় অভাব অভিযোগের মধ্যে আছি। বাবা কোন দিনই খোঁজ খবর নেইনা। উল্টো আমার মায়ের নামে থাকা সম্পত্তি অন্য এক মহিলাকে আমার মা সাজিয়ে জাল দলিল করে রেজিষ্ট্রি করে নিয়েছে। এই ঘটনায় আমার মা আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছে। আমি সঠিক তদন্ত করে এই ঘটনার সঠিক বিচার দাবি করছি এবং এই প্রতারণার সাথে যারা জড়িত আছে তাদের কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
প্রতরণার মাধ্যমে জাল দলিলে সাবেক স্ত্রীর নামে থাকা সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠা আবু হানিফের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
২ নং আসামী শহিদুল ইসলাম ও ৩ নং আসামী জিয়াউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাদের এলাকায় পাওয়া যাইনি। মামলার ৩ নং আসামী আবু হানিফের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে হামিদা খাতুনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকেও পাওয়া যাইনি।
সাবেক স্ত্রীর জমি জাল দলিলে রেজিষ্ট্রি করে নেওয়ার ঘটনায় আবু হানিফের প্রতিবেশী ও সচেতন এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম না প্রকাশের শর্তে, আবু হানিফের এক প্রতিবেশী জানান, প্রতরণা করা হানিফের জন্মগত বদ অভ্যাস। তবে সম্পত্তির লোভে নিজের স্ত্রী সন্তানদের সাথে এই বয়সে প্রতরণা করবে এটা কোনভাবেই আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। সঠিক তদন্ত করে এই প্রতরণার সাথে যারা জড়িত আছে সকলকে আইনের আওতায় নিয়ে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে উদিবাড়ী এলাকার সচেতন মহল।
