কুষ্টিয়ায় সংঘবদ্ধ হত্যাকারী এবং ডাকাত চক্রের ৫ সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার
কুষ্টিয়ার শান্তিময় জনপদ খোকসা উপজেলাকে অশান্ত করে মরিয়া হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে একটি সঙ্গবদ্ধ চক্র। যে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি ও খুনসহ নানান অপকর্মের সাথে জড়িত। অবশেষে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার খাইরুল আলমের দিক নির্দেশনায় এবং কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ ও খোকসা থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে ঐ সঙ্গবদ্ধ চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।

কুষ্টিয়ায় সংঘবদ্ধ হত্যাকারী এবং ডাকাত চক্রের ৫ সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার
গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার (২৭ শে জুন) দুপুর ২টার সময় কুষ্টিয়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন পুলিশ সুপার খাইরুল আলম। গ্রেফতারকৃত হলেন- রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার বসা এলাকার মনছের মন্ডলের ছেলে মতিয়ার মন্ডল (৪৭), একই এলাকার মতিয়ার মন্ডলের ছেলে শান্ত মন্ডল (২০), কুষ্টিয়ার জেলার খোকসা থানার ওসমানপুর কলপাড়া এলাকার মজিদ শেখ’র ছেলে সাহস শেখ (২১), খোকসা উপজেলার খানপুর এলাকার জাহিদুল ইসলাম’র ছেলে রয়েল হোসেন এবং খোকসা উপজেলার বসোয়া পূর্বপাড়া’র দুলাল প্রমানিক এর ছেলে শুকাই আলী (২৫)।
জানা যায়, এই সঙ্গবদ্ধ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে খোকসা ও আশেপাশের এলাকায় ডাকাতি, হত্যা এবং লুটপাটসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত। ৫ জনকে আটকের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর সব অজানা তথ্যের উদঘাটন করেছে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ। এই ডাকাত দলের সদস্যরা নিজের মধ্যে ডাকতির মালামাল ভাগবাটোরা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে গত ১৮ জুন রাত আনুমানিক ১টা ১০ মিনিটের সময় নিজ ডাকাত দলের ২ জন সদস্যকে জবাই করে হত্যা ও গড়াই নদীর খানপুর চরে বালির নীচে তাদের লাশ পুতে রাখে এবং ঐ একই দিন খোকসা পৌর এলাকায় পৌরসভার পাশেই অসীম পালের বাড়ীতে রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটের সময় ডাকাতি করে নগদ দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ১৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার মালামাল লুট করে। এদিকে খুন ও ডাকাতির ঘটনায় খোকসা থানায় দুইটি পৃথক মামলা হয়। খুন এর ঘটনায় ২১ জুন পেনাল কোড’র ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় মামলা হয়। যার মামলা নং ৮ এবং ডাকাতির ঘটানয় ১৮ জুন পেনাল কোড’র ৩৯৫/৩৯৭ ধারায় মামল হয়। যার মামলা নং ৬।
২ জনকে হত্যার বিষয়ে পুলিশ সুপার খাইরুল আলম সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানান, ১৭ জুন অসীম পালের বাড়ীতে ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে ডাকাত দলের সদস্যরা প্রথমে তার বাড়ীতে রেকি করে। ডাকাতি করার কয়েক ঘন্টা আগে ডাকাত দলের ১৭ থেকে ১৮ জন সদস্য খোকসা থানাধীন আইয়ুব এর ঘাটে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক একত্রিত হয়। পরবর্তিতে ডাকাত দলের সদস্য ঘাট পার হয়ে খানপুর চরে আসে এবং তাদের মধ্যে পূর্ব বিরোধের জের ধরে কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার দৌলতখান এলাকার হুরমত আলী’র পুত্র সামাদ (৩৩) এবং ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর থানার বিপ্লব মৃধা’র পুত্র ফারুক (২৮) সাথে ডাকাত দলের অন্য সদস্যদের কথা কাটাকাটি হয়। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ডাকাত দলের অন্য সদস্যরা সামাদ ও ফারুক’কে হত্যা করে বালির নীচে লাশ পুতে রাখে এবং ডাকাতির উদ্দেশ্যে অসীম পালের বাড়ীর দিকে রওনা হয়।
ডাকাতির বিষয়ে পুলিশ সুপার খাইরুল আলম সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের জানান, অসীম পাল, অসীম পাল প্রতিদিনের ন্যায় তার প্রত্যাহিক কাজ শেষে রাত আনুমানিক ১০টার সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। পরবর্তিতে ১৭ জুন দিবাগত রাত (১৮ ই জুন) আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটের সময় ডাকাত দলের সদস্যরা অসীম পালের বাড়ীর প্রাচীর টপকিয়ে অসীম পালের বসতবাড়ীর ভিতর প্রবেশ করে। এরপর বাড়ীর মেইন গেটেরে দুইটি তালা এবং বাড়ীর কেচি গেটের দুইটি তালা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে প্রবেশের পরে অস্ত্রের মুখে ভয় ভীতি প্রদর্শন করে। এছাড়াও ডাকাত সদস্যরা পরিবারের সদস্যদের জানে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে স্বর্ণের একটি চিক হার, স্বর্ণের এক জোড়া কানের দুল, স্বর্ণের চারটি আংটি, স্বর্ণের একজোড়া শাখা বাধানো চুড়ি লুট করে। যার সর্বমোট ওজন সাত ভরি এবং আনুমানিক মূল্য ছয় লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা।
সংবাদ সম্মেলন কালে পলিশ সুপার খাইরুল আলম আরো জানান, অসীম পালের বাড়ীতে ডাকাতি শেষে ডাকাত দলের সদস্যরা অসীম পালের বড় ভাই অশোক পালের বাড়ী থেকে নগদ দুই লক্ষ টাকা, সাত ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট করে। যাহার আনুমানিক মূল্য ছয় লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা। এছাড়াও অশোক পালের পাশের ঘর থেকে ৩ হাজার ১৫০ প্যাকেট ডার্বি সিগারেট যাহার মূল্য এক লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা, অশোক পালের ভাতিজা অর্পিতা পালের ব্যবহৃত এইচপি ব্রান্ডের একটি ল্যাপটপ যাহার মূল্য পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা, ঘরের বিভিন্ন কক্ষ থেকে পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত সাতটি মোবাইল ফোন যাহার আনুমানিক মূল্য পঁচাত্তর হাজার টাকা। ঐ রাতে ডাকাত দল ১৫ লক্ষ ৫ হাজার টাকা মূল্যের মালামাল এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা লুট করে।
এদিকে এই ঘটনা কুষ্টিয়া জেলা সহ সমগ্র বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার সাথে সাথেই কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খাইরুল আলমের নির্দেশে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও খোকসা থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তকালে খোকসা থানা পুলিশ স্থানীয় বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে সাইবার ক্রাইম ইউনিট তাদের সর্বোচ্চ তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সাথে জড়িত আসামীদের সনাক্তকরণ, গ্রেফতার ও লুন্ঠিত মালামাল উদ্ধারের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) সার্কেল এর তত্বাবধানে খোকসা থানার অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও খোকসা থানার চৌকস টিম নিয়ে রাজবাড়ী জেলা ও কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে।

কুষ্টিয়ায় সংঘবদ্ধ হত্যাকারী এবং ডাকাত চক্রের ৫ সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার
অভিযান পরিচালনাকালে ঘটনার সাথে জড়িত ৫ জন আসামীকে গ্রেফতার করে। এদিকে আসামীদের গ্রেফতারের সময় মতিয়ার মন্ডলের নিকট থেকে নগদ দুই হাজার তিন শত বিশ টাকা এবং ২৭ প্যাকেট ডার্বি সিগারেট, শান্ত মন্ডলের নিকট থেকে এইচপি ব্যান্ডের একটি ল্যাপটপ, সাহস এর নিকট থেকে নগদ পনের শত চল্লিশ টাকা এবং ২০ প্যাকেট ডার্বি সিগারেট, রয়েল এর নিকট থেকে সাতাইশ শত পঞ্চাশ টাকা এবং ১৫ প্যাকেট ডার্বি সিগারেট, শুকাই এর নিকট থেকে ছাব্বিশ শত ত্রিশ টাকা এবং ২৫ প্যাকেট ডার্বি সিগারেট উদ্ধার করা হয়। সর্বমোট নয় হাজার দুই শত চল্লিশ টাকা, ৮৭ প্যাকেট ডার্বি সিগারেট এবং এইচপি ব্যান্ডের একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ডাকাত সদস্যদের বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে দুই ভরি স্বর্ণালংকার ও ডাকাতির জন্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া ছয় রাউন্ড শর্টগানের গুলি উদ্ধার করা হয়।
ডাকাতির সেই রাতে ঘটনার বর্ননা দিতে গিয়ে অসীম পাল সাংবাদিকদের সামনে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, রাত দুইটা ১৫ মিনিটের দিকে আমি ঘুমের ঘরে হঠাৎ করে একটা শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দ শোনর পর আমি ঘরের দরজা খুলতে যাওয়ার সময় দেখি তারা আমাদের গেটের ও ঘরের কেচি গেটের তালা কেটে ভিতরে প্রবেশ করেছে। প্রথমে তারা আমার ভাস্তের রুমে ঢুকে। তাদের কাছে (ডাকাতদের কাছে) লোহার শক্ত রড ছিলো। যেটা দিয়ে তারা দরজার ফাঁকে ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে দরজা খুলে ফেলে। ভাস্তের রুমে ঢুকে তার ভাস্তেকে বেঁধে ফেলে। এরপর চার পাঁচ জন আমার দরজার উপর এসে ঝাঁপাই পড়ে। সেই সময় তারা শার্টারগান দেখিয়ে আমাকে ভয় দেখায়। সবার মুখ বাঁধা থাকার কারণে আমি কাউকে চিনতে পারি নাই।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসীম পাল বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ও ব্যাপক চেষ্টা এবং পরিশ্রম করে জেলার একটা সঙ্গবদ্ধ ডাকাত দলকে ধরতে পেরেছে এই জন্য আমি পুলিশ সুপার এর কাছে কৃতজ্ঞ।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার খাইরুল আলম বলেন, কোন অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। জেলা পুলিশ কুষ্টিয়া জনগনের জীবন ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। তা না হলে চাঞ্চল্যকর এই ডাকাতি ও হত্যা মামলার আসামীরা এত দ্রুত গ্রেফতার হতো না। পুলিশ সুপার খাইরুল আলম আরো বলেন, ডাকাত দলের পলাতক অনান্য সদস্যদের দ্রুত গ্রেফতার করার জন্য অভিযান অব্যহত আছে। তাদের দ্রুত গ্রেফতারের স্বার্থে ঘটনা সংশ্লিষ্ট আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।
