Hardinge Bridge and Lalon Shah Bridge
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। তারই অংশ হিসেবে কুষ্টিয়া জেলা নদ-নদী দ্বারা বিশেষভাবে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। এখানকার নদীগুলো শুধু ভৌগোলিক গঠনেই নয়, বরং কৃষি, পরিবেশ, জনজীবন ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আজকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো কুষ্টিয়া জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর ইতিহাস, গতিপথ এবং ভৌগোলিক গুরুত্ব।

পদ্মা নদীর উপর দিয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ
পদ্মা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী এবং হিমালয় থেকে উৎপন্ন গঙ্গার প্রধান শাখা। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদনদী ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু।
উৎপত্তি: হিমালয় থেকে গঙ্গা নদীর ধারায়, ভারতের ফারাক্কা বাঁধের পরে পদ্মা নামে প্রবেশ করে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশে দৈর্ঘ্য: প্রায় ১২১ কিলোমিটার
গড় প্রস্থ: ১০ কিলোমিটার
সর্বোচ্চ গভীরতা: ১,৫৭১ ফুট (প্রায় ৪৭৯ মিটার)
গড় গভীরতা: ৯৬৮ ফুট (প্রায় ২৯৫ মিটার)
বৈশিষ্ট্য: সর্পিলাকার প্রকৃতি, বিশাল পানিধারা, এবং বিভিন্ন শাখা নদীর জন্মদাত্রী
বিশেষ ঐতিহাসিক তথ্য: পদ্মার করাল ভাঙনে ধ্বংস হয়েছে রাজা রাজবল্লভের কীর্তি, তাই পদ্মার আরেক নাম “কীর্তিনাশা”
পদ্মার উপর নির্মিত ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেশের অন্যতম পুরাতন রেল সেতু, যা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সংযোগকারী।

গড়াই নদী একসময় গঙ্গার (বর্তমান পদ্মা) একটি প্রাথমিক ধারা হিসেবে প্রবাহিত ছিল। বর্তমানে এটি পদ্মার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদী।
উৎপত্তিস্থল: কুষ্টিয়া জেলার হতাশ হরিপুর ইউনিয়নে পদ্মা নদী হতে
প্রবাহপথ: কুষ্টিয়া → ঝিনাইদহ → মাগুরা → মধুমতিতে মিলিত
ঐতিহাসিকতা: হুগলি-ভাগীরথী ছিল গঙ্গার আদিধারা, কিন্তু গড়াই হয়ে একসময় প্রধান ধারা প্রবাহিত হতো
বৈশিষ্ট্য: গড়াই নদীর প্রবাহ এখনো কুষ্টিয়ার সেচ ও পরিবেশ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ

মাথাভাঙ্গা নদী একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, যা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে জল প্রবাহ সংযোগ স্থাপন করে।
দৈর্ঘ্য: ১২১ কিলোমিটার
গড় প্রস্থ: ২৯ মিটার
গভীরতা (দর্শনার নিকট): প্রায় ১০ মিটার
অববাহিকার আয়তন: প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটার
প্রবাহপথ: কুষ্টিয়া → মেহেরপুর → চুয়াডাঙ্গা
বৈশিষ্ট্য: এটি জোয়ার-ভাটার প্রভাবমুক্ত, এবং সাধারণত বন্যাপ্রবণ নয়
কুমার নদ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ নদী।
দৈর্ঘ্য: ১২৪ কিলোমিটার
গড় প্রস্থ: ৭৫ মিটার
প্রবাহপথ: চুয়াডাঙ্গা → কুষ্টিয়া → ঝিনাইদহ → মাগুরা
বিশেষত্ব: এই নদী কৃষির জন্য অতীব উপযোগী এবং কুষ্টিয়ার বহু অঞ্চলে সেচব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত
কালীগঙ্গা নদী কুষ্টিয়া জেলার গড়াই নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করে ঝিনাইদহ জেলায় প্রবাহিত হয়।
উৎপত্তি: গড়াই নদী, কুষ্টিয়া জেলা
প্রবাহপথ: কুষ্টিয়া → ঝিনাইদহ সদর
বৈশিষ্ট্য: দক্ষিণমুখী সরল প্রবাহ, কৃষিতে পানির অন্যতম উৎস
হিসনা নদী কুষ্টিয়া জেলার অন্যতম ছোট নদী হলেও স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থায় তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উৎপত্তি: পদ্মা নদী
প্রবাহপথ: কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা থেকে বাহাদুরপুর ইউনিয়ন অভিমুখে
বৈশিষ্ট্য: পশ্চিমমুখী ধীর প্রবাহ
মরণাই নদী
বড়াল নদী (পদ্মার প্রাচীন ধারা হিসেবে বিবেচিত)
ভেড়ামারা ও কুমারখালীর ছোট নদীগুলোর সংযোগ উপখাল
কুষ্টিয়া জেলার নদীগুলো এ অঞ্চলের কৃষি, জীবনযাপন, পরিবেশ, ইতিহাস ও পর্যটন—সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, কুমার—এই নদীগুলো শুধু জলধারা নয়, বরং কুষ্টিয়ার ভূমি ও মননের বহমান ইতিহাস। এসব নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জনবসতি, শিল্প, কৃষি এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা উপাখ্যান।
