কুষ্টিয়া মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ দূষিত পানিতে হুমকির মুখে পরিবেশ
কুষ্টিয়া মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। মারা যাচ্ছে মাছ ও পশুপাখি। হুমকির মুখে চাষাবাদ। জনস্বাস্থের উপরও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, অপরদিকে দূষিত বর্জ্যে মশা মাছির জন্ম হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস থাকলেও কোন কার্যক্রম চোখে পড়েনা তাদের।

কুষ্টিয়া মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ দূষিত পানিতে হুমকির মুখে পরিবেশ
কুষ্টিয়া মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ ২৪ শর্তে পেয়েছে পরিবেশের ছাড়পত্র। তবে প্রথম শর্ত মানা হচ্ছে না। জানা যায়, আবাদি জমির উন্নয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন জিকে সেচপ্রকল্পের খাল মানুষের জন্য ভয়াবহ করে তুলছে কুষ্টিয়া মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ। প্রথম শর্তে উল্লেখ্য করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড ও প্রক্রিয়া দ্বারা কোনভাবেই পরিবেশ (মাটি, পানি ও বায়ু) দূষণ করা যাবে না।
কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ভাদালিয়ায় অবস্থিত (স্বস্তিপুর মৌজা) কুষ্টিয়া মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ এর কারখানার পেছনে গা ঘেঁষে রয়েছে জিকে খাল। কুষ্টিয়া মেটালের দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরাসরি যাচ্ছে জিকে সেচ খালে। খালের পানিতে মরা মাছ ভাসতে দেখা যায়। সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মরা মাছ ধরছে।
স্থানীয় কয়েকজন নারী জানান, কুষ্টিয়া মেটাল এর বিষাক্ত পানি জিকে খালে ঢুকছে। এতে আমাদের হাঁস এই পানিতে নেমে মারা যাচ্ছে। ওরা টাকাওয়ালা ক্ষমতাধর। ওদের জন্য আমরা হাঁস-মুরগি পালন করতে পারছি না। শুধু বিষক্ত পানি না, তাঁরা তাদের টয়লেটের লাইন সরাসরি জিকে খালে দিয়ে রেখেছে। এখানে আমরা গোসল করতে পারিনা। ওদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে সাহস পায়না।
এই পানি দিয়ে কৃষি কাজ করাও যায়না। জিকে ক্যানালের ময়লা দুর্গন্ধ বর্জ্যে জন্ম দিচ্ছে মশা। পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ে খালের পাশের বসতিদের হাস-মুরগী পশু পাখি মারা যাচ্ছে। এক সময়ে এ খালে মানুষ গোসল করতো, মানুষেরা এই খালের পানি নিত্য কাজে ব্যবহার করতো। কিন্তু এখন সেখানকার পানিতে নামলেই চুলকানী ধরে। সেখানকার পানির কারণে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ দেখা দেয়। এ ব্যাপারে প্রয়োজনী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এলাকাবাসী।
পরিবেশ অধিদফতরের শর্তসমূহ তুলে ধরা হলো
১. প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড ও প্রক্রিয়া দ্বারা কোনভাবেই পরিবেশ (মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ) করা যাবে না।
২. ইএমপি প্রতিবেদনে বর্ণিত সকল মিটিগেশন মেজার্স কার্যকরীভাবে চালু রাখতে হবে।
৩. এ ছাড়পত্র শুধুমাত্র এ্যালুমিনিয়াম সামগ্রী হাড়ি পাতিল ইত্যাদি প্রস্তুতের জন্য প্রযোজ্য হবে। প্রকল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি জায়গা সম্প্রসারণ, উৎপাদন প্রক্রিয়া বা তৎসংশ্লিষ্ট কোন প্রকার পরিবর্তনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি ছাড়পত্রের প্রয়োজন হবে।
৪. কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ইউনিট হতে বস্তুকণার নিঃসরণ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭-এ উল্লিখিত মানমাত্রার মাধ্যমে হতে হবে।
৫. এ কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য বিদেশ হতে কোন প্রকার বর্জ্য আমদানি করা যাবে না।
৬. স্ক্রাপ গলানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া পরিশোধনের জন্য নির্মাণকৃত অরৎ ঞৎবধঃসবহঃ চষধহঃ (অঞচ) কার্যক্ষম রাখতে হবে।
৭. কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে ও এতদসংক্রান্ত রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে এবং অত্র দপ্তরের আকস্মিক পরিদর্শনের সময় তা দেখাতে হবে।
৮. কারখানার পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল রাখতে হবে। কারখানার/প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দৈনিক ভিত্তিতে রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতি তিন মাস অন্তর সংরক্ষিত রেকর্ডের সার-সংক্ষেপ রিপোর্ট আকারে পরিবেশ অধিদপ্তরে দখিল করতে হবে।
৯. স্বাভাবিক নিয়মে প্রতি ৩ (তিন) মাস অন্তর অন্তর অর্থাৎ বছরে ৪ (চার) বার কারখানার বায়ুর গুণগতমান (ঝচগ) বিশ্লেষণের ফলাফল অত্র দপ্তরে দাখিল করতে হবে।
১০. কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট তরল বর্জ্য সরাসরি পরিবেশে নির্গমন করা যাবে না। তরল বর্জ্য নিউট্রালাইজেশন (ঘবঁঃৎধষরুধঃরড়হ) ট্রাঙ্কে স্লাজ অধঃক্ষিপ্ত হওয়ার পর পরিশোধিত তরল বর্জ্য নির্গমন করতে হবে।
১১. কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহের তথ্যাদি একটি রেজিষ্ট্রারে সংরক্ষণ করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্তৃক পরিদর্শনকালে উক্ত রেজিষ্ট্রারটি পরীক্ষা করা হবে। কারখানার এড়ড়ফ ঐড়ঁংব কববঢ়রহম ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে।
১২. কারখানা চত্ত্বরের নূন্যতম ৩৩% জায়গা উপযুক্ত প্রজাতির গাছ লাগিয়ে সবুজায়ন করতে হবে।
১৩. পরিবেশ দূষণ রোধ কল্পে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অফিসের কাজ পরিচালনার জন্য সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে।
১৪. কারখানার শব্দ এবং তরল/বায়বীয় বর্জ্যরে নিঃসরণ/নির্গমন মাত্রা যথাক্রমে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭-এ বর্ণিত মানমাত্রার মধ্যে হতে হবে।
১৫. অগ্নি নির্বাপনকল্পে কারখানায় যথোপযুক্ত ব্যবস্থাদি যথাঃ ফায়ার এক্সিট, ফোমিং কম্পাউজসহ ফায়ার হাইড্রেন্ট, ইমারজেন্সী লাইট স্থাপন, ভূ-গর্ভস্থ বা ভূ-উপরিস্থ জলাধারে সর্বদা পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ ইত্যাদি ব্যবস্থাদি সার্বক্ষণিক কার্যকরী রাখতে হবে।
১৬. প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক/কর্মচারীদের সর্বদা নোজ মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং পেশাগত স্বাস্থ্য রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে।
১৭. এই ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ (ত্রিশ) দিন পূর্বে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হবে। বিধি মোতাবেক প্রতি বৎসর ছাড়পত্র নবায়ন করা না হলে এ ছাড়পত্র বাতিল করা হবে।
১৮. দূষণ নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে প্রযোজ্য অন্য যে কোন শর্ত প্রতিপালনে কর্তৃপক্ষ বাধ্য থাকবে।
১৯. প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জনসাধারণ কর্তৃক কোন অভিযোগ উত্থাপিত হলে এবং অত্র দপ্তর কর্তৃক তার সত্যতা প্রমাণিত হলে এ ছাড়পত্র বাতিল বলে গণ্য হবে।
২০. এই ছাড়পত্র কোন অবস্থাতেই হস্তান্তর করা যাবে না।
২১. এ ছাড়পত্র ভূমির মালিকানা স্বত্ব নির্ধারণ করে না।
২১. এ ছাড়পত্র ভূমির মালিকানা স্বত্ব নির্ধারণ করে না। প্রতিষ্ঠান সংশিষ্ট জায়গা ব্যবহারে কোন মামলা মোকদ্দমা বা মালিকানা বিষয়ে কোন অভিযোগ উত্থাপিত হলে এই ছাড়পত্র বাতিল বলে গণ্য হবে।
২২. পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক ও পরিদর্শনের ¶মতাপ্রাপ্ত অন্যান্য কর্মকর্তাগণ কারখানা পরিদর্শনকালে ছাড়পত্র/নবয়নপত্র দেখতে চাইলে তা দেখাতে হবে এবং ছাড়পত্র/নবায়নপত্র কারখানার এমন স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে হবে যাতে তা সহজে দেখা যায়।
২৩. বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত, ২০১০) এবং পরিবেশ সংর¶ণ বিধিমালা, ১৯৯৭ (সংশোধিত, ২০০২) এর সকল বিধিবিধান প্রতিপালন করতে হবে। অন্যথায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে উপরিলিখিত শর্ত সমূহ ঊহভড়ৎপব করা হবে।
উলেখিত অভিযোগের ভিত্তিতে কুষ্টিয়া মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ এর চেয়ারম্যান হাজী রশিদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আপনে দেখে করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার সিনিয়র কেমিস্ট হাবিবুল বাসার বলেন, ২৪টা শর্ত সাপেক্ষে কুষ্টিয়া মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ কে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। শর্ত না মানলে ছাড়পত্র বাতিল করা হবে।
