মিজানুর রহমান নয়ন, খোকসা ॥ গ্রামীণ সড়ক ঘেঁষে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। মাঠের এক কোণে প্রায় ৩৩ শতাংশ জমি জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক বটগাছ। চারদিকে অন্তত ১৪টি ছোট-বড় ঝুরি মূল গাছটিকে ঠেস দিয়ে রেখেছে। সবুজ, শ্যামল, ছায়াঘেরা সেই বটগাছের নিচে বিছানো বিভিন্ন রঙের ত্রিপল, পাটি ও কাপড়। তার ওপরে বসে এবং দাঁড়িয়ে কয়েকশ মানুষ। কেউ গাইছেন গান, কেউবা মুগ্ধ হয়ে শুনছেন।
গতকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে কুষ্টিয়ার খোকসার বেতবাড়ীয়া ইউনিয়নের একতারপুর গ্রামে সরেজমিনে এমনই দৃশ্য দেখা গেছে। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা বাংলার প্রাণ লোকগানকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং ঐতিহ্য ফেরাতে সেখানে বসেছিল এক প্রাণবন্ত লোকগানের আসর। খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরি এই আয়োজন করে। বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি আর লালনগীতির সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
স্থানীয়রা বলছেন, এটি কেবল গান শোনার অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি মিলনমেলা। তাদের ভাষ্য, বটগাছটির বয়স আনুমানিক একশ বছরের বেশি।
একতারপুর গ্রামের ষাটোর্ধ রামদাস পাল বলেন, “বটগাছটির বয়স ১০০ বছরের বেশি। ৩০-৩৫ বছর আগে পাড়া-মহল্লায় জারি, সারি, লোকগানের আসর বসতো। এই বটতলায় প্রথমবার এমন আয়োজনে খুশি সকলেই।”
ঈশ্বরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সুস্মিতা পাল বলে, “জীবনে প্রথমবার লোকগান শুনছি। সবুজ প্রকৃতি, খোলামেলা পরিবেশ। মায়ের সঙ্গে এসে খুবই ভালো লাগছে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় এবং আমন্ত্রিত দেড় শতাধিক বাউল শিল্পী দোতারা, একতারা, ঢোল আর বাঁশির তালে তালে গান পরিবেশন করছেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে শিল্পীরা গানের অর্থ, তার পেছনের ইতিহাস ও দর্শন ব্যাখ্যা করছেন। আর এসব গানের শ্রোতা ছিলেন নানা বয়সী ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ।
আসরে ছুটে আসা বাংলাদেশ প্রবীণ-তারুণ্য সংগঠনের সভাপতি শাহিদা ইসলাম বলেন, “গানে গানে জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। যা তরুণ প্রজন্মকে মানবিক হতে শেখায়।”
শ্রোতা শিল্পী রাণী বলেন, “ইউটিউব, ফেসবুকের যুগে এমন আসর মনে করিয়ে দেয় এই গানে মাটির গন্ধ আছে, প্রাণের শান্তি আছে।”
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কুষ্টিয়া আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট খন্দকার সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমাদের সমাজকে উন্নয়ন করার জন্য, বিবেককে জাগ্রত করার জন্য, আমাদের চিন্তাকে প্রফুল্ল করার জন্য এই সমাজ ও রাষ্ট্রকে কিছু দেবার জন্য লোকগানের আসর বেশি বেশি প্রয়োজন।”
আয়োজক ও খোকসা কমিউনিটি লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা জসিম উদ্দিন বলেন, “হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে এবং তরুণ সমাজকে মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতে ও সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে এমন আয়োজন। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে। এতে প্রায় দেড় শতাধিক শিল্পী অংশ নিয়েছেন।









