জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের হুঁশিয়ারি
নিজ সংবাদ ॥ ৭ দফা দাবি মেনে না নিলে এক দফার আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের অধিকার আদায়ের প্রয়োজনে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা যাওয়ার প্রয়োজন হলে তাঁরা প্রস্তুত কি না। এ সময় সমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা প্রস্তুত হন, আপনারা পারবেন।’
গতকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাত ১২টার দিকে কুষ্টিয়ার আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে তিনি সরকারের প্রতি সাত দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
সকাল ৮টায় ঢাকার বায়তুল মোকাররম থেকে শুরু হওয়া লং মার্চটি খুলনা হয়ে কুষ্টিয়ায় এসে শেষ হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাত ১২টার দিকে সমাপনী সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রিয় কুষ্টিয়াবাসী কেমন আছেন। এত রাত! বিকাল থেকে শুরু করে এখন প্রায় বারোটা বাজতে চলল। আসলে কুষ্টিয়ার আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে আজকে বারোটা বাজতেছে। কিন্তু এর আগেই বর্তমান সরকার জাতির বারোটা বাজায় দিছে।
তিনি বলেন, ১১তম তৃতীয় লং মার্চ ঢাকা থেকে শুরু করে এখন কুষ্টিয়ায়। সমাপনী সমাবেশে উপস্থিত জাতীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, প্রিয় কুষ্টিয়াবাসী ও সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, আমরা আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি আপনাদের দাবি নিয়ে। আমাদের কোন দলীয় দাবি নাই। আমরা যে ৭টা দাবি নিয়ে নেমেছি এটা বাংলাদেশের আপামর জনগণের দাবি।
সরকার জনগণকে অপমান করেছে অভিযোগ করে জামায়াতের আমির বলেন, আপনাদেরকে বর্তমান সরকার অপমান করেছে। আমরা তার প্রতিবাদ জানাতে এবং আপনাদের সাথে একত্রিত হয়ে তার প্রতিশোধ নিতে আমরা এখানে এসেছি।
তিনি বলেন, আপনারা ৭০ ভাগ জনগণ চেয়েছিলেন বাংলাদেশে একটা পরিবর্তন। রাজনীতির নোংরা ধারাকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে নতুন একটা বাংলাদেশ আপনারা চেয়েছিলেন। ১৪ শ এর অধিক আমাদের সন্তানরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে ফ্যাসিবাদকে হটিয়ে একটা নতুন বাংলাদেশ আমাদেরকে উপহার দিয়ে গিয়েছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা সবাই সেই শহীদদের কথা বলি। কিন্তু আফসোসের বিষয় আমাদের সরকার কার্যত এই শহীদদেরকে সম্মান করে না। সম্মান যদি করত তাহলে শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে একটা বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তারা যে স্বপ্ন দেখেছিল, ন্যায়বিচারের যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল তারই দলিল হচ্ছে আপনাদের গণভোট, মানলো না।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মান্নান সাহেব বলেছেন, একটা মানলেও আর একটা মানে না। এক মায়ের জমজ দুই সন্তান। হয় দুইটাই বৈধ, নয় দুইটাই অবৈধ। গণভোট অবৈধ হয় আর সংসদ নির্বাচনের ভোট বৈধ হয়। একই তরকারির গোশত হালাল কিন্তু সুরা হারাম। এই ফতোয়া তারা সংসদের দাঁড়ায় দিচ্ছেন আবার বাইরেও দিচ্ছেন।
আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা চাইনি এমন একটা আন্দোলন বাংলাদেশের এক মাথা থেকে আরেক মাথায়। আমরা চেয়েছিলাম, আপনাদের মূল্যবান ভোটে যে সংসদ গঠিত হয়েছে অনুরূপভাবে একটা সংস্কার পরিষদও গঠন হবে। এবং তারা সংসদে বসেই তার ফয়সালা করবে।
সরকার সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পাওয়ার কারণে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, তারা যেতো কায়দা করে, ইঞ্জিনিয়ারিং করে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সিট দখল করে নিয়েছে এজন্য তারা এখন ধরাকে সরাজ্ঞান করছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতে চাই, ইতিহাসে যখনই জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য অপমান করা হয়েছে তখন সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে, দলকে করুন পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ভালই ভালই মেনে নিন, আমাদের একটা দাবিও দলীয় দাবী না। সবগুলোই জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। ৭ দফা যদি মেনে নেন তাহলে ১ দফার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু ৭ দফা না মানলে ১ দফা অনিবার্য হয়ে উঠবে। সেই ১ দফার ডাক আমরা দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, অধিকার রক্ষার স্বার্থে দিতে বাধ্য হব।
এরপর কুষ্টিয়াবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আজকে আমরা ঢাকা থেকে লং মার্চ করে কুষ্টিয়া এসেছি। যদি ওই এক দফার প্রয়োজনে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা যাওয়া লাগে আপনারা কি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত! টাকা পয়সা লাগবে? খাবার দাবার লাগবে? আমাদের কাছে কোন বিরিয়ানি নাই, টাকা পয়সা দিতে পারব না।
দেশ রক্ষার আন্দোলনে সবাইকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশ আমাদের সবার, এই দেশকে রক্ষা করার জন্য লড়তে হবে সবাইকে। আমরা আপনাদেরকে কথা দিচ্ছি, জনগণের অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ের যদি আল্লাহ পছন্দ করেন তাহলে জীবন যাবে তারপরও আমরা অন্যায়ের কাছে মাথানত করবো না। ইনশাল্লাহ জনগণের এই দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরবো।
তিনি বলেন, আপনারা প্রস্তুত হন, আপনারা পারবেন। আপনাদেরই এক সন্তান আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়ে তার জীবন দিয়েছে। সেটা দিয়ে সে প্রমাণ করেছেন সে দেশকে ভালবাসে। আপনারাও নিশ্চয়ই দেশকে ভালোবাসেন, আমরাও দেশকে ভালবাসি। আমরা আপনাদের জন্যই রাস্তায় নেমেছি।
বক্তব্যের শেষাংশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সর্বাবস্থায়, অনুকূল-প্রতিকূল, সামনে যাই পড়ুক সকল আবর্জনা পরিষ্কার করে ইনশাল্লাহ জনগণের অধিকার আদায় করে আমরা ঘরে ফিরব।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা উপস্থিত ছিলেন।








