খোকসা প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার খোকসায় বিদ্যালয়ের সামনে পাকা রাস্তা ও নতুন নির্মিত ড্রেনের মধ্যে তিন ফুট চওড়া গর্ত রেখে কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে খোকসা উপজেলা সদরের এই সড়কটি পথচারী ও স্কুলগামী শিশুদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই সেখানে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সম্প্রতি গর্তে পড়ে এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হলেও কর্তৃপক্ষের নজর মেলেনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা সদরের বাসস্ট্যান্ডের পূর্ব দিক থেকে খোকসা-একতারপুর ভায়া বনগ্রাম আরসিআইপি সড়কের নলেপাড়ার মোড় পর্যন্ত ৭১৫ মিটার রাস্তাটি এতদিন কাদা ও জলাবদ্ধতায় চলাচলের অনুপযোগী ছিল। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) আরসিসি রাস্তা এবং খোকসা পৌরসভা পাকা ড্রেন নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতা কমলেও তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। সদ্য নির্মিত রাস্তা ও ড্রেনের মধ্যে প্রায় দুই ফুট গভীর, তিন ফুট চওড়া ও পৌনে ২০০ মিটার দীর্ঘ গর্ত রেখে ঠিকাদাররা নিজ প্রকল্পের কাজ শেষ করেছেন।
এই সড়ক দিয়ে খোকসা জানিপুর সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। এ ছাড়া নিকটস্থ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯০০ শিক্ষার্থী, দুটি কেজি স্কুল ও কয়েকটি মাদ্রাসার কয়েকশ শিশু শিক্ষার্থী এই রাস্তা ব্যবহার করে। সড়কে নিরাপত্তা সোল্ডার না থাকা এবং অন্যপাশে গভীর গর্ত থাকায় বড় যানবাহন এলে শিশুদের লাফ দিয়ে গর্তে পড়তে হয়।
সম্প্রতি ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে গর্তে পড়ে সালসাবীল (১২) নামে খোকসা জানিপুর সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর হাত ভেঙে যায়। এক মাস চিকিৎসার পরও স্বাভাবিকভাবে হাত সোজা করতে পারছে না সে। প্রতিনিয়ত তাকে যন্ত্রণানাশক ওষুধ খেতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী সালসাবীল জানায়, একটি ইঞ্জিনচালিত গাড়ি আসতে দেখে ভয়ে সে গর্তে নেমে যায় এবং পড়ে গিয়ে এই দুর্ঘটনার শিকার হয়।
আব্দুল আজিজ নামে এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আগে রাস্তায় পানি জমলেও যাওয়া-আসা করা যেত। এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাদে নামতে হচ্ছে। অবিলম্বে গর্ত ভরাট করে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। জানিপুর সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাহেরা সুলতানা রুনা এবং সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম জানান, দুটি বড় প্রতিষ্ঠানের মাঝের রাস্তাটি এমনিতে সরু করা হয়েছে, তার ওপর সোল্ডারে মাটি না দিয়ে বিপজ্জনক গর্ত রাখা হয়েছে। বারবার অভিযোগ করেও সুরাহা হয়নি।
মন্টু মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আলীম রেজা আকু অভিযোগ করেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও এক্সক্যাভেটর দিয়ে ড্রেন কাটার সময় তৈরি হওয়া মাটি বিক্রি ও লুটপাট করা হয়েছে। তিনি ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে কাজের মান যাচাই এবং গাফিলতির সঠিক তদন্ত দাবি করেন।
এলজিইডি ৭১৫ মিটার রাস্তার জন্য ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়, নাসির এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। অন্যদিকে পৌরসভার কোভিডের অধীন প্রকল্পের আওতায় ড্রেন নির্মাণের জন্য ৩১ লাখ টাকা বরাদ্দ পায় রেশমা এন্টারপ্রাইজ (সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ বাস্তবায়ন করে বাবু এন্টারপ্রাইজ)। কাজ শেষে চূড়ান্ত বিলের জন্য ঠিকাদাররা দৌড়ঝাঁপ করছেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে বাবু এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সিডিউলে মাটির কাজ ছিল না এবং জমানো মাটি এলজিইডির ঠিকাদার রাস্তায় দিয়ে দিয়েছে।’ অন্যদিকে এলজিইডির ঠিকাদার নাসির উদ্দিনের দাবি, তাদের প্রকল্পের কাজের মান ভালো হয়েছে। রাস্তার পাশের গর্ত ভরাটে মাটির কাজ করবে পৌরসভা।
এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন অভিযোগ করে বলেন, তাদের প্রকল্পে মাটি কাটার বিষয় ছিল না। পৌরসভার ঠিকাদার এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কেটে বিক্রি করেছে।
এ বিষযে পৌরসভার প্রকৌশলী মামুনুর রশিদ টিপু অবশ্য জানান, অতিবৃষ্টির কারণে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে এবং পৌরসভা দ্রুত মাটি দিয়ে তা ভরাট করার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। উপজেলা প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম সদ্য যোগদানের কথা জানিয়ে বিষয়টি বিস্তারিত খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।









