দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা পদ্মা নদীর তীরবর্তী উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গত কয়েকদিন ধরে পদ্মার প্রবল স্রোতে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, চলাচলের রাস্তা, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও সীমান্তের বিভিন্ন অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। পদ্মার প্রবল স্রোতে একের পর এক ঘরবাড়ি ও বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীতে ধসে পড়তে দেখা গেছে। ভাঙনের কারণে ওই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে পদ্মায় নতুন করে পানি প্রবেশের পর থেকেই ভাঙন শুরু হয়েছে। তবে গত দুই থেকে তিন দিনে নদীর স্রোত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
তাদের অভিযোগ, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আলাইপুর এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে পদ্মার স্রোতের চাপ এদিকে বেশি পড়ছে। এতে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে বলে দাবি তাদের। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দুই মাস ধরে এলাকায় কমবেশি ভাঙন চললেও সাম্প্রতিক কয়েক দিনে নদীর স্রোত এতটাই তীব্র হয়েছে যে, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, চলাচলের রাস্তা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
এর আগে গত জুলাই মাসে দৌলতপুরের মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়াড় ও কোলদিয়াড় এলাকায়ও ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দেয়। মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনে কয়েকশ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। নদীর তীব্র স্রোতে ওই এলাকার আনুমানিক ৪০০ থেকে ৬০০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেললে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচরের বাসিন্দারা জানান, সীমান্তঘেঁষা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে তাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পদ্মার পানি কমে গেলে আবার চর জেগে ওঠে এবং সেখানে চাষাবাদ শুরু করেন তারা। কিন্তু ভাঙনের কারণে প্রতিবছরই নতুন করে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারাতে হচ্ছে তাদের। স্থানীয়রা আরও জানান, উদয়নগরে আগে বিজিবির একটি ক্যাম্প ছিল। নদীভাঙন প্রতিরোধে ক্যাম্পের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় জিও ব্যাগসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হতো। কিন্তু গত বছর ভাঙনের কবলে পড়ে ক্যাম্পটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
একই সঙ্গে কয়েকশ বিঘা জমি ও বহু ঘরবাড়ি নদীতে হারিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল সরকার বলেন, উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকার বসতভিটা, চলাচলের রাস্তা, ফসলি জমি, বৈদ্যুতিক খুঁটি এমনকি সীমান্তের কিছু অংশও পদ্মার প্রবল স্রোতে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে ভাঙন চলছে, তবে আজ থেকে এর তীব্রতা অনেক বেড়েছে। নদীর স্রোত সবকিছু ভেঙেচুরে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী বাঘা উপজেলার আলাইপুরে বেড়িবাঁধ দেওয়ার কারণে পদ্মার পানির পুরো চাপ আমাদের উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকায় পড়ছে।
ভাঙন এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই আতারপাড়া, উদয়নগর ও ডিগ্রীরচর নামে কোনো গ্রাম থাকবে না। চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, পদ্মায় নতুন করে পানি প্রবেশ করায় প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়েছে। এতে উদয়নগর, ডিগ্রীরচর ও আতারপাড়া এলাকার বাড়িঘর, ফসলি জমি এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ফায়ার সার্ভিসের একটি টিমসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আমরা ওই এলাকায় বৈঠক করেছি। সীমান্তঘেঁষা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় সেখানে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা সহজ নয়।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে পদ্মায় পানি প্রবেশ করায় ভাঙনকবলিত এলাকায় শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, আমি মাত্র দুই দিন হলো কুষ্টিয়ায় যোগ দিয়েছি। ভাঙনকবলিত এলাকা বা পানির পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত অবগত নই। অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বন্যার পানি ও ভাঙন পরিস্থিতি সম্পর্কে পরে জানানো হবে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পদ্মার ভাঙনে অল্প সময়ের মধ্যেই আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং দুর্গম চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।









