দখল আর দূষণে নাই হয়ে যাচ্ছে জিকের এস-৪ টি-১ খাল
প্রভাবশালীদের দখল আর দূষণে বিপর্যস্ত এবং নাই হয়ে যাচ্ছে জিকের (গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প) এস-৪ টি-১ খাল। এ প্রধানখাল থেকে প্রবেশ মুখের প্রায় এক কিলোমিটার এ খালের দুপাশে দখল করে মাত্র দেড়ফুট ব্যাসের পাইপ বসিয়ে ভরাট করে রেখেছে প্রভাবশালীরা।

দখল আর দূষণে নাই হয়ে যাচ্ছে জিকের এস-৪ টি-১ খাল
এ ছাড়াও ওই প্রভাবশালীদের অটো রাইচমিলের নোংরা পানি বর্জ্য পাইপের মাধম্যে সরাসরি ফেলা হচ্ছে এ খালে এবং বর্জ্যে ভরাট হয়ে থাকায় প্রতি মৌসুমে জিকের সরাবরাহ পানি পায়না ভুক্তভোগী কৃষকেরা। এতে ভোগান্তিতে তিন গ্রামের কয়েক হাজার চাষী।
খালটির অবস্থান কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নের বটতৈল, কবুরহাট ও শিমুলিয়া গ্রামে। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের প্রধান খাল থেকে (বটতৈল গ্রাম) শুরু হয়ে কবুর হাট কদমতলা গ্রাম হয়ে শিমুলিয়া গ্রামে গিয়েছে। এই সেচ খালের আওতায় প্রায় এক হাজার ৮’শ বিঘা চাষ যোগ্য জমি আছে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা কৃষি অফিসার সৌতম কুমার শীল।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল গ্রামে সরেজমিন দেখা গেছে, বাবুরহাট কদমতলা এলাকায় সেচ খালের মাঝে দেড়ফুট ব্যাসের পাইপ দিয়ে খাল ভরাট করা হয়েছে। এই খালের দখলদার ও দূষণকারিরা হলেন, কদমতলা বাবুরহাট এলাকায় অবস্থিত তারা রাইস মিল মালিক ফরিদুল ইসলাম তারা, আব্দুল্লাহ এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস মালিক আনোয়ার হোসেন এন্ড ব্রাদার্স, কাবিল এগ্রো ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেড এর মালিক ইসমাইল হোসেন মুরাদ, আহাদ এগ্রো ফুড মালিক আমিরুল ইসলাম এবং ভূসি মালের ব্যবসায়ী মেসার্স লিয়াকত আলী। অপরদিকে কুষ্টিয়া-পোড়াদহ সড়কের অপরপাশের জাফর ফুড প্রোডাক্টস ও এগ্রো ফুড প্রোডাক্ট থেকে বটতৈল পোড়াদহ সড়কের নীচ দিয়ে পাইপের মাধ্যমে এস-৪ টি-১ খালে বর্জ্য পানি ফেলেন প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক আবু জাফর মোল্লা।
সেচ খাল ধরে কিছুদুর গিয়ে দেখা মেলে কৃষক দিদার হোসেন (৬৩) এর সাথে। তিনি ৫ কাঠা জমিতে ঘাস লাগানোর জন্য রাইস মিলের ছাই-বর্জ্য দিয়ে ভরাট হওয়া ক্যানেল থেকে স্যালো ইঞ্জিন দিয়ে জমিতে পানি দিচ্ছিলেন।
তিনি মোট পাঁচ বিঘা জমি আবাদ করেন জানিয়ে বলেন, এই ক্যানেলের পানি দিয়ে বটতৈল, কবরহাট ও শিমুলিয়া তিন গ্রামের আবাদ হত। কিন্তু এখন রাইস মিল থেকে এই ক্যানালে ফেলানো মাজা (কোমর) সমান ছাই এর কারনে ক্যানেলের পানি আসে না, যদিও আসে নিকটতম জমিগুলোতে ভাইটে চলে (উপচিয়ে পড়ে) যায়, মাথা পর্যন্ত গন্তব্য স্থল পর্যন্ত পৌঁছায় না।

তিনি আরো বলেন, এই মাঠে ৮/৯ বছর আগেও তিনটি ফসল হতো। এখন ক্যানেলে পানি আসে না, আমরা শ্যালো দিয়ে (সেচ) আবাদ করছি। মিলের ছাই-বর্জ্য দিয়ে ক্যানেলটি প্রায় তিন ফুট ভরাট হয়ে গেছে, পানি যখন বেশিদূর যেতে পারেনা। এই ক্যানেলটা তিন কিলোমিটার লম্বা। এক কিলোমিটার পানি সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, আর দুই কিলোমিটারে পানি পৌঁছায় না। তিনি (আঙ্গুল উচিয়ে দেখান) ওই দেখুন রাস্তার ওপাশ থেকে জাফর মিলের পানি পাইপ দিয়ে খালে আসছে।
এরপর সেচ খাল সেচ খাল ধরে ৫’শ মিটার গিয়ে দেখা মেলে কবুরহাট এলাকার চাষী একুব্বার হোসেন (৭১) এর সাথে। তিনি বলেন, এই ক্যানেলের পানি আমাদের কোন উপকারে আসে না। পচা দুর্গন্ধযুক্ত এই পানির সেচ দিলে ধানের গোড়া থেকে পচে যায়। ধানের ফলন ভালো হয় না, বিঘা প্রতি ৭/৮ মন ধান পাওয়া যায়। আমার মত (একুব্বার) ক্ষুদ্র চাষী যাদের ৪/৫ বিঘা জমি আছে, ডীপ টিউবয়েলের পানি নিলে (বিঘাপ্রতি চার হাজার টাকা) দিতে হয়, কোন মতেই খরচ উঠে না। এর আগে ৪ কাঠা জমি বিক্রি করে বীজ,সার ও পানির দেনা (বাকী) শোধ করছেন বলে তিনি দাবী করেন।
তিনি আরো বলেন, প্রায় দশ বছর আগে বাবুল চেয়ারম্যান (সাবেক স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ) এই ক্যানেলটাকে খনন করেছিল। খননের পর কিছুদিন একটু পানি ছিল। কিছুদিন পর আবার যা তাই হয়েছে! তিনি বলেন গত ৭/৮ বছরে রাইস মিলের ছাই ও বর্জ্য পানির কারনে ক্যানালের ৩-৪ ফুট ভরাট হয়ে গেছে। যেটুকু আছে সে টুকু পচা দুর্গন্ধযুক্ত। আমরা গরিব চাষী, টাকা ওয়ালা মিল মালিকদের সাথে পারিনা।
বটতৈল গ্রামের কৃষক মনির ও খলিল বলেন, এর আগে একবার এই ক্যানাল খনন করা হয়েছিল, সে সময়ও ক্যানেলের ভরাট জায়গা দখল মুক্ত না করে খনন করায় সে খনন আমাদের (ভুক্তভোগী কৃষকদের) কোন উপকারে আসেনি। আবারও সেই আগের মতোই দখল-ভরাট স্থান বাদ রেখে খনন কাজ চলছে। এভাবে বার বার খনন করে জনপ্রতিনিধিদের পকেট ভরলেও আমাদের(কৃষকদের) কোন ফায়দা হয়না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মিলন মন্ডল বলেন, এই ক্যানালের সাথে কবুরহাট উত্তরপাড়া আমার একটি মাছ চাষের পুকুর রয়েছে। পূর্বে হটাৎ ক্যানালের বিষাক্ত নোংরা পানি ঢুকে পড়ে আমার পুকুরে। এতে কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমার পুকুরের সব মাছ মরে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকার ক্ষতিসাধন হয়। এ ব্যাপারে স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ এলাকার প্রধানবর্গরা সমোঝতায় বসলে সে সময় ওই অটো রাইস মিলের মালিকেরা প্রতিশ্রুতি দেন যে ক্যানালে কোন প্রকার নোংরা পানি বর্জ্য ফেলবা না এবং তাদের নিজস্ব জায়গায় বর্জ্য শোধনাগার করবে। কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি রাখেনি।
স্থানীয় বটতৈল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিন্টু ফকির ক্যানালটি দখল ও দূষণের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ক্যানালটি দখল ও দূষণে এ অঞ্চলের কৃষকদের চাষাবাদে বিঘ্ন হচ্ছে। এ কথা মাথায় রেখে আবেদনের পেক্ষিতে ক্যানালটি খননের মাধ্যমে পানি চঞ্চলাচলের জন্য ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ নিয়ে খননের কাজও শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ক্যানালের যে সব স্থান ভরাট করে পাইপ বসিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই সব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে এবং এ ব্যাপারে ইউএনও কে অবগত করা হয়েছে। কোন সারা না পেয়ে ওই সব স্থান বাদ রেখেই খনন কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। কেননা ভরাট করে দখল করে রাখায় খননের জন্য সেখানে ভেকু প্রবেশের জায়গা পর্যন্ত নেই।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া সদর ইউএনও বিধান কুমার বিশ্বাস বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। আমি স্থানীয় তৌসিলদার বলে দিয়েছি। উনি সরেজমিনে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
বাপাউবো কুষ্টিয়া নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বটতৈল এলাকায় জিকের প্রধান থেকে শুরু হয়ে এস-৪ টি-১ সেচ খালটি (ক্যানাল) কবুর হাট গ্রাম হয়ে শিমুলিয়া গ্রামে গিয়েছে। এই খালের কোন অংশ ইজারা বা ভাড়া দেয়া হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, কুষ্টিয়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হামিদ বলেন, সাইটটি ভিজিট করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলে দেয়া হবে ।
