শুধু বিক্রেতা নয়, মাদকের গডফাদার পর্যন্ত যাবো
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়াকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন জেলার নবাগত পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বাহকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মাদকের নেপথ্যে থাকা ‘গডফাদারদের’ও আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, “কথা দিচ্ছি, শুধু মাদক বিক্রেতা নয়—আমি গডফাদার পর্যন্ত যাবো।” মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত কুষ্টিয়া গড়তে পুলিশকে নতুনভাবে সাজানোর পাশাপাশি পুলিশের অভ্যন্তরীণ কিছু সিস্টেমেও পরিবর্তন আনার কথা জানান তিনি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেল পৌনে ৪টায় কুষ্টিয়া পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে জেলার কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন নবাগত পুলিশ সুপার।
মতবিনিময় সভায় জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ও সন্ত্রাস দমন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, থানায় দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ, পুলিশ সদস্যদের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত, টহল ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পুলিশ-গণমাধ্যমের পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন তিনি।
নবাগত এসপি মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, কুষ্টিয়াকে মাদকমুক্ত করা তার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শুধু মাদক বহনকারী বা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করেই অভিযান শেষ করা হবে না।
তিনি বলেন, “আমার প্রথম চাওয়াই হচ্ছে কুষ্টিয়াকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করা। শুধু মাদক বিক্রেতাকে নয়, মাদকের যারা গডফাদার রয়েছেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে চাই। আপনাদের কথা দিচ্ছি, আমি গডফাদার পর্যন্ত যাবো।”
মাদক ব্যবসার সঙ্গে কারা নেপথ্যে থেকে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকেও তথ্য ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন পুলিশ সুপার।
নবাগত পুলিশ সুপার বলেন, কুষ্টিয়া পুলিশের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পুলিশি সেবা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ কিছু সিস্টেম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “কুষ্টিয়া পুলিশকে ঢেলে সাজাতে চাই। আমাদের অভ্যন্তরীণ কিছু সিস্টেম পরিবর্তন করতে চাই।” পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনে আরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।
থানাকেন্দ্রিক দালালচক্রের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে এসপি বলেন, এখন থেকে থানায় কোনো দালালের স্থান হবে না। একই সঙ্গে থানায় বসে সালিশ-মীমাংসা করারও সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী জনগণকে সেবা দেওয়া। থানায় বসে অনানুষ্ঠানিকভাবে সালিশ বা মীমাংসার নামে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
তার এ ঘোষণাকে থানাকেন্দ্রিক সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান পুলিশ সুপার।
তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এজন্য কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা হবে।
এসপি বলেন, “কিশোর গ্যাং দূর করার জন্য কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মিটিং এবং উঠান বৈঠক প্রোগ্রামগুলো আমরা অ্যাক্টিভ করবো। সচেতনতামূলক প্রোগ্রামগুলো বাড়ানো হবে, যাতে এ ধরনের সমস্যাগুলো না হয়।”
পুলিশ সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলা এবং টহল ডিউটিতে অনিয়ম ঠেকাতেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়েছেন নবাগত এসপি।
তিনি বলেন, টহল পার্টির অবস্থান সবসময় পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কোন পুলিশ কর্মকর্তা কখন কোথায় দায়িত্ব পালন করছেন, তা নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে।
পুলিশ সুপার বলেন, “টহল পার্টির অবস্থান সব সময় জানার জন্য আমি ব্যবস্থা করবো। অনলাইন সিস্টেম চালু করছি, যাতে একজন পুলিশ অফিসার কোথায় আছেন, কখন কোন থানায় আছেন—তা ট্র্যাকিং করতে পারি। আশা করি পুলিশ আর ঘুমাবে না।”
মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, পেশাদারিত্ব, সেবা ও সততাকে সামনে রেখে কুষ্টিয়াবাসীর নিরাপত্তায় পুলিশ সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করবে। অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
পুলিশ ও গণমাধ্যম পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করলে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মতবিনিময় সভায় জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা অংশ নেন। এ সময় তারা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক, কিশোর অপরাধ, সন্ত্রাস, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং নাগরিকদের নানা সমস্যা পুলিশ সুপারের সামনে তুলে ধরেন।
সাংবাদিকরা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, অপরাধ দমন এবং জনবান্ধব পুলিশিংয়ে নবাগত পুলিশ সুপারের উদ্যোগে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
নবাগত পুলিশ সুপারও সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ এবং অপরাধ ও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় কুষ্টিয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ, জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআই-১, কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির হোসেনসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নবাগত এসপির বক্তব্যে মাদক ব্যবসার নেপথ্যের কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, থানায় দালালমুক্ত পরিবেশ, সালিশ-মীমাংসা বন্ধ, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ সদস্যদের প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির যে ঘোষণা এসেছে, তা বাস্তবায়ন হলে কুষ্টিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে—এমন প্রত্যাশা করছেন সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা।








