কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স
প্রকাশ: ১৩ই আগস্ট ২০২৬, ১:২৮ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে সরকারি ধান সংগ্রহ নিয়ে সদরপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতা মো. সাহাবুল ইসলাম ও ছাতিয়ান ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. লুতফর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের কথা থাকলেও তালিকায় হত ভূমিহীন ও কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নন এমন অনেকের নাম রাখা হয়েছে।
পরে তাদের নাম ব্যবহার করে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সদরপুর ও ছাতিয়ান ইউনিয়নের অন্তত ২০ জন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকে কাছে । তাদের অভিযোগ, লটারিতে কার নাম উঠেছে, কখন ধান গুদামে দিতে হবে কিংবা ব্যাংক থেকে ধানের টাকা কীভাবে পাওয়া যাবে এসব বিষয় অনেক কৃষকই জানেন না।কৃষকের নাম ব্যবহার করে , মিরপুর ও হালসা সরকারি খাদ্যগুদামে সাহাবুল ইসলামের প্রায় ১ হাজার ৭৫০ মণ এবং লুতফর রহমানের প্রায় ১ হাজার ৮০০ মণ ধান দেওয়া হয়েছে।
সরকার নির্ধারিত প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে এই ধানের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫১ লাখ ১২ হাজার টাকা। এর মধ্যে সাহাবুল ইসলামের নামে দেওয়া ধানের মূল্য প্রায় ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং লুতফর রহমানের নামে দেওয়া ধানের মূল্য প্রায় ২৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এই চক্র দরিদ্র, ভূমিহীন ও দিনমজুরদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করে তাদের নামে সরকারি গুদামে ধান দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
লটারির মাধ্যমে কৃষক বাছাই করা হলেও তালিকায় প্রকৃত কৃষকের পাশাপাশি অনেক অকৃষকের নামও রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। কৃষকদের আরও অভিযোগ, তালিকায় নাম ওঠার পর অনেককে ব্যাংকে নিয়ে হিসাব খোলা হয়। পরে তাদের কাছ থেকে চেকের পাতায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তাদের নামে গুদামে ধান দেওয়ার পর ব্যাংক থেকে ধানের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কৃষকদের দাবি, যাদের নামে ধান দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকের নিজের জমি নেই। তারা আদৌ ধান চাষ করেন কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য জমির কাগজপত্র, লটারির তালিকা, খাদ্যগুদামের হিসাব এবং ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা। সদরপুরের কৃষক মো. খলিল বলেন, “কৃষকদের না জানিয়ে তালিকায় নাম তোলা হয়েছে। লটারিতে কার নাম এসেছে, সেটিও অনেক কৃষক জানেন না।”
ছাতিয়ানের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, “এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আমরা সরকারি গুদামে ধান দিতে চাই। কিন্তু কখন কীভাবে ধান দিতে হবে, কীভাবে তালিকায় নাম আসে এবং ব্যাংক থেকে টাকা কীভাবে তুলতে হয় এসব বিষয়ে অনেক কৃষককে ঠিকমতো জানানো হয়নি।” মিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা শৈলেন কুমার পাল বলেন, “আমি ৭ দিন হলো এখানে যোগদান করেছি।
ধান সংগ্রহের তালিকা তৈরির কাজ কীভাবে হয়েছে, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি উপজেলা খাদ্য বিভাগ ভালো বলতে পারবে।” হালসা খাদ্যগুদামের খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহাবুল আলম বলেন, কৃষি বিভাগের তালিকা ও অনলাইনের কার্যক্রমের বাইরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষ থেকেও চাপ ছিল। বিষয়টি সামলাতে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে সদরপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সাহাবুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ছাতিয়ান ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. লুতফর রহমান ফোনে বলেন, “আমি বর্তমানে বাইরে আছি। এ বিষয়ে সন্ধ্যার পরে কথা বলব।” মিরপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আশরাফুজ্জামান শাহীন বলেন, “বিষয়টা জানা নেই। ব্যক্তিস্বার্থে কারো অনিয়ম করে থাকে, দল তার দায় নেবে না। দায় ঐ ব্যক্তিকেই নিতে হবে।”
মিরপুরের স্থানীয় সাংবাদিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারি ধান সংগ্রহের তালিকা, লটারি, খাদ্যগুদামে ধান জমা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উত্তোলনের বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হোক। প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে অন্য কারও নামে ধান দেওয়া হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য